‘গণ-অবস্থান ও ভাবগানের আসর’ অনুষ্ঠানে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজারে
‘গণ-অবস্থান ও ভাবগানের আসর’ অনুষ্ঠানে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজারে

মানতের টাকা চুরি করেন বলেই মাজার থেকে পাগলদের তাড়াতে চান: ফরহাদ মজহার

‘মাজারে মানতের একমাত্র অধিকারী আশ্রয়হীন, নিরক্ষর ও ক্ষুধার্ত মানুষ। কিন্তু সেই মানতের টাকা, মাজারের টাকা লুট করবেন—সেটি আমরা চলতে দেব না। এই মানতের টাকা চুরি করেন বলেই আপনি মাজার থেকে পাগলদের তাড়াতে চান গাঁজা খাওয়ার কথা বইলা।’ কথাগুলো বলেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।

হামলার শিকার রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজারে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘গণ-অবস্থান ও ভাবগানের আসর’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন ফরহাদ মজহার। ‘সাধু-গুরু-ভক্ত ও ওলি-আউলিয়া আশেকান পরিষদ’ এবং ‘ভাববৈঠকী’ যৌথভাবে এই গণ-অবস্থান কর্মসূচি ও ভাবগানের আয়োজন করে। ‘সাধু-গুরু-ভক্ত ও ওলি-আউলিয়া আশেকান পরিষদ’ এবং ‘ভাববৈঠকী’র প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ রোমেল গণ-অবস্থান কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন।

১৪ মে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মাদক ও অনৈতিক কাজের অভিযোগ তুলে শাহ আলী মাজারে হামলা করে একদল লোক। এ সময় মাজারে জিয়ারত ও মানত কার্যক্রম চলছিল। হামলার ঘটনায় মাজারের ভক্ত রেশমি বেগম বাদী হয়ে রাজধানীর শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে রেশমি বেগম বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও এর সহযোগী সংগঠনের ১০০ থেকে ১৫০ নেতা-কর্মী মাজারের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে তাঁদের ওপর হামলা করেন। তবে পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। এ মামলায় মঙ্গলবার পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে শাহ আলী থানা-পুলিশ।

এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার শাহ আলী মাজারে তিন দিনব্যাপী (১৯-২১ মে) বার্ষিক ওরস মাহফিল শুরু হয়েছে। সারা দেশ থেকে হাজার হাজার সাধু-গুরু- ভক্ত-আশেকান নারী-পুরুষ এই ওরসে অংশ নিয়েছেন। হামলার পর ওরসে অংশ নেওয়া ভক্তদের সাহস জোগাতে এই গণ-অবস্থান কর্মসূচি ও ভাবগানের আয়োজন করা হয়।

গণ-অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘মাজারের পাগলদের তাড়াতে চান আর সারা বাংলাদেশকে আপনারা তামাক চাষের ক্ষেত্র বানাইছেন। কই, সিগারেটের বিরুদ্ধে যে কথা বলেন না? মদের বিরুদ্ধে তো কেউ বলেন না? আপনারা তো হোটেলে গিয়ে বলেন না যে এখানে মদ খাওয়া নিষিদ্ধ আর খাওয়া যাবে না। পাগলের বিরুদ্ধে কেন আপনাদের এত হুমকি? কারণ, আপনারা মাজারের টাকা লুট করতে চান। পাগলের হক লুট করতে চান।’

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এটা তার হক। আপনারা তাকে বঞ্চিত করেছেন রাষ্ট্রের অধিকার থেকে। আপনারা তাকে বঞ্চিত করেছেন সামাজিক অধিকার থেকে। কোনো দিন খোঁজ নেন নাই।’

মানুষের আচার-আচরণ বা আকিদা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মাজার সবার জন্য বলে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘এখানে সবাই সম্মান পাবে। কেউ ওয়াজ করতে চাইলে করবে, কেউ গান গাইতে চাইলে গাইবে। তবে কেউ কারও কাজে বাধা দিতে পারবে না। নামাজে বাধা দেওয়া যাবে না, গান বা জিকিরেও বাধা দেওয়া যাবে না।’

‘গণ-অবস্থান ও ভাবগানের আসর’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজারে

মাজার থেকেই সত্যিকারের গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হতে হবে বলে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘সমাজ যদি সবাইকে নিয়ে চলতে চায়, তাহলে তার রাজনৈতিক ভিত্তিও মাজারের দর্শনের মতো হতে হবে। যদি বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হতে হবে মাজার থেকেই।’

মাজারের প্রতিটি টাকার হিসাব নেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন ফরহাদ মজহার। হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা এ দেশে থাকতে পারে নাই। ফলে আপনারা মাজারকে দখল করে আবারও দুর্নীতি এবং নেশাদ্রব্যের ব্যবসা করবেন; আর গরিব মানুষ যদি একটু খায়, তাদের ধরে পেটাবেন, তা হতে দেব না।’

মাজারের ভক্তদের উদ্দেশে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘তোমরা যদি পাগল হয়ে থাকো, তোমরা যদি নবীর আশেকান হয়ে থাকো, তাহলে মাজারের আদব রক্ষা করতে হবে। এতটা উচ্ছৃঙ্খল হবে না। উচ্ছৃঙ্খল হওয়া আমাদের কাজ না। যদি তোমরা উচ্ছৃঙ্খল না হও, তাহলে গাঁজা ব্যবসায়ীদের আমরা ধরব।’

মোহাম্মদ রোমেল বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পরে সারা দেশে এক শর বেশি মাজারে হামলা হয়েছে, যা কোনোভাবেই মানা যায় না। কারণ, বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানে সব মত-পথের মানুষ ছিল। নারীরা ছিল। মাজার এমন একটা জায়গা, যেখানে নারীরা আসতে পারেন। যেকোনো ধর্মের মানুষ আসতে পারেন। সে রকম একটি জায়গায় হামলা মানে মাজারের মধ্যে বৈচিত্র্যের সম্মিলনে হামলা।

রোমেল আরও বলেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর মনে করা হয়েছিল দেশের এই অবস্থার উন্নতি ঘটবে, সেই আগের মতোই মাজারে হামলা চলছে।

অবস্থান কর্মসূচিতে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তরের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সাইফুল ইসলাম, বাসদের (মার্ক্সবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা জসীম উদ্দিন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শাহ আলী থানার সাবেক আহ্বায়ক রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন।