
রোববার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার কথা জানায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভাষ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) আন্দোলনের মুখে গত রোববার দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ‘সাধারণ শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাই’–এর ব্যানারে আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের দাবি, ওই দুই শিক্ষকের একজন ইসলামবিদ্বেষী, অপরজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
চাকরিচ্যুত দুই শিক্ষক হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মোহসিন এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গতকাল বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ক্লাস বন্ধ থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লায়েকা বশীরের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রথমে অনলাইনে ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করেন। এরপর সেমিস্টার বিরতি শেষে রোববার ক্লাস শুরুর প্রথম দিনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করে। সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জানায়, দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
চাকরিচ্যুত দুই শিক্ষক হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মোহসিন এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর।
শিক্ষক লায়েকা বশীর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি শুনেছেন তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অব্যাহতিপত্র পাননি। তিনি জানান, ‘মুখঢাকা গৃহকর্মী কর্তৃক মোহাম্মদপুরের জোড়া খুনের ঘটনা’র পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ ডিসেম্বর তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। তিনি হিজাব ও নেকাবের নিরাপত্তাঝুঁকির দিকটি তুলে ধরেছিলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে পোস্ট দেননি। সেই পোস্ট নিয়ে ইউএপির প্রাক্তন কিছু শিক্ষার্থী অনলাইনে তাঁকে হুমকি দেন ও কুৎসা রটনা করতে থাকেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গতকাল বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ক্লাস বন্ধ থাকবে।
লায়েকা বশীর বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলাম, এ কারণে আমাকে আওয়ামী দোসর ট্যাগ দেওয়া হয়নি। তবে ইসলামবিদ্বেষী ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।’ তিনি বলেন, গতকাল সোমবার ‘ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে ডানপন্থী শিক্ষার্থীদের মব সন্ত্রাস’ শিরোনামে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছেন তিনি।
চাকরিচ্যুত এ এস মোহসিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী দোসর’ ট্যাগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ তাঁর অপসারণ দাবি করে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নেই জানিয়ে বলেন, ‘একটি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর মবের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতি স্বীকার করেছে। আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’
এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাই ব্যানারে রোববার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘শায়খ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে ছবি তোলার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে কারণ দর্শানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, হিজাব ও নেকাব পরার কারণে মুসলিম শিক্ষার্থীদের হেনস্তার অভিযোগে শিক্ষক লায়েকা বশীরের স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান ইসলামবিদ্বেষ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে’ সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের একজন মোহাম্মদ মারুফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ করা হয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে মব সন্ত্রাস বললে কিছু বলার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটি অনেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ শুনেছে, যাঁরা ইসলামপন্থী পোশাক পরার কারণে শিক্ষক লায়েকা বশীরের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কমিটি কালক্ষেপণ করা শুরু করলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তিনি জানান, মঙ্গলবারও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে তাঁরা এক হবেন।
আওয়ামী দোসর’ ট্যাগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ তাঁর অপসারণ দাবি করে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নেই জানিয়ে বলেন, ‘একটি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর মবের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতি স্বীকার করেছে। আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।চাকরিচ্যুত এ এস মোহসিন
দুই শিক্ষকের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে ইউএপির উপাচার্য কামরুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বা দাবির মুখে নয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুসারে দুই শিক্ষককে অপসারণ করা হয়েছে। শিক্ষক লায়েকা বশীর ফেসবুকে ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করতে পারেন, সেটা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু সেই মত প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি শ্রেণিকক্ষকে টেনে এনেছেন এবং পোশাক নিয়ে কথা বলেছেন, যা ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত দিয়েছে। তাঁর চাকরিচ্যুতির বিষয়ে শ্রেণিকক্ষকে টেনে আনার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপর শিক্ষককে অপসারণের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
ক্লাস বন্ধের ঘোষণা
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গতকাল বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, চলমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ক্লাস বন্ধ থাকবে। যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলাম, এ কারণে আমাকে আওয়ামী দোসর ট্যাগ দেওয়া হয়নি। তবে ইসলামবিদ্বেষী ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।শিক্ষক লায়েকা বশীর
শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতি
ইউএপির দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সংগঠনটি গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য থাকায় সুপরিকল্পিতভাবে ও নানা অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতাকে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে খর্ব করা হয়েছে। তা ছাড়া শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।