জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমেছেন প্রতিবাদে। ৮ মার্চ ২০২৪
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমেছেন প্রতিবাদে। ৮ মার্চ ২০২৪

ক্ষমতার নয়, জনতার জুলাই

বছর ঘুরে জুলাই ফিরে আসে হাজারো শহীদের রক্তের দায় নিয়ে। যে আকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্ন নিয়ে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল, তার কতটুকু আমরা পূরণ করতে পেরেছি, সে প্রশ্নের উত্তর নির্মোহভাবে খোঁজার কঠিন দায় আমাদের রয়েছে। জুলাইকে স্মরণ করা মানে সেই প্রতিশ্রুতির কাছে ফিরে যাওয়া। নিজেদের জিজ্ঞাসা করা—যে বৈষম্য, অন্যায়, দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই বাংলাদেশ গড়ার পথে আমরা কত দূর এগোতে পেরেছি।

শহীদ রিয়া, শহীদ নাঈমা, শহীদ নাফিসার পরিবারের মতো হাজারো শহীদের পরিবারের জীবনে আর কোনো দিনই স্বাভাবিক জুলাই ফিরে আসবে না। ঠিক তেমনই স্বাভাবিক জুলাই আর আসবে না আমার মতো প্রতিদিন জুলাইয়ের রাস্তায় থাকা অসংখ্য মানুষের জীবনেও। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে রাজপথ রঞ্জিত করা অসংখ্য তরুণের মনে জুলাই যে ছাপ এঁকে দিয়েছে, তা আজীবন আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে। জুলাই আমাদের প্রজন্মের শুধু সাহসের আখ্যানই নয়, আমাদের অসমাপ্ত দায়িত্ব পূরণ করার দলিলও বটে।

জুলাই আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে আমি জানি, কোনো গণ–অভ্যুত্থান এক দিনে তৈরি হয় না। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, অগণিত নামহীন মানুষের সাহস, অসংখ্য অচেনা মুখের সংহতি মিলেই একটি গণ–অভ্যুত্থান জন্ম নেয়। সেই ইতিহাস যদি আমরা লিখে না রাখি, তাহলে একদিন ক্ষমতার ইতিহাসই একমাত্র ইতিহাস হয়ে দাঁড়াবে।

চেক লেখক মিলান কুন্দেরা লিখেছিলেন, ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম মূলত বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ প্রতিটি গণ–অভ্যুত্থানের পর ইতিহাস নিয়ে নতুন লড়াই শুরু হয়। কে নেতৃত্ব দিয়েছিল, কে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল, কার অবদান বেশি ছিল, সে বিতর্ক সামনে চলে আসে। কিন্তু এই বিতর্কের ভিড়ে হারিয়ে যায় সাধারণ মানুষের গল্প।

ইতিহাস কেবল বড় ঘটনাকেই মনে রাখে। ইতিহাসে নায়কের খেতাব পেয়ে যান সেই মানুষেরা, যাঁরা সময়ের সঙ্গে নিজেদের সেই ঘটনার প্রধান কুশীলব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। অথচ জুলাই আন্দোলনের একজন সংগঠক হিসেবে আমি জানি, কোনো গণ–অভ্যুত্থান এক দিনে তৈরি হয় না। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, অগণিত নামহীন মানুষের সাহস, অসংখ্য অচেনা মুখের সংহতি মিলেই একটি গণ–অভ্যুত্থান জন্ম নেয়। সেই ইতিহাস যদি আমরা লিখে না রাখি, তাহলে একদিন ক্ষমতার ইতিহাসই একমাত্র ইতিহাস হয়ে দাঁড়াবে।

চেক লেখক মিলান কুন্দেরা লিখেছিলেন, ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম মূলত বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।’ প্রতিটি গণ–অভ্যুত্থানের পর ইতিহাস নিয়ে নতুন লড়াই শুরু হয়। কে নেতৃত্ব দিয়েছিল, কে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল, কার অবদান বেশি ছিল, সে বিতর্ক সামনে চলে আসে। কিন্তু এই বিতর্কের ভিড়ে হারিয়ে যায় সাধারণ মানুষের গল্প।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে ছাত্রলীগ, এরপর রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর হামলা করে। পরে তৎকালীন প্রশাসন হল খালি করে দেয়। অসংখ্য শিক্ষার্থী হল ছাড়তে বাধ্য হয়। তারপরও আমরা কয়েকজন ছাত্রী হল না ছেড়ে প্রতিবাদস্বরূপ হলে অবস্থান করেছিলাম। বিদ্যুৎবিহীন, খাবার-পানিবিহীন নির্ঘুম, অন্ধকার সেই রাতগুলোয় আমাকে সাহস জুগিয়েছিল জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রীরা, পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আমার হলের খালারা, যাঁদের কেউই অভ্যুত্থানের পর কোনো কিছু দাবি করেননি। তাঁরা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন নিজেদের নৈতিকতা থেকে।

মনে পড়ে ৩ আগস্ট রাতের কথা, যখন ছাত্রলীগ–যুবলীগের আক্রমণে আমরা কোনোভাবেই নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন এক অসমসাহসী নারী রিকশাচালক আমাদের আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ৪ আগস্ট দুপুরে যখন সামনে পুলিশের গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট আর পেছনে আওয়ামী লীগের গুন্ডা সন্ত্রাসীরা; তখন কাঁটাবন মোড়ে এক অকুতোভয় মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের খাবার আর পানি দিতে। প্রয়োজন পড়লে যেন আসতে পারি, তাই নিজের বাসাটাও চিনিয়ে দিয়েছিলেন।

বিদ্যুৎবিহীন, খাবার-পানিবিহীন নির্ঘুম, অন্ধকার সেই রাতগুলোয় আমাকে সাহস জুগিয়েছিল জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রীরা, পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আমার হলের খালারা, যাঁদের কেউই অভ্যুত্থানের পর কোনো কিছু দাবি করেননি। তাঁরা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন নিজেদের নৈতিকতা থেকে।

ইতিহাস জুলাইয়ের এই মায়েদের মনে রাখেনি। ইতিহাস জুলাইয়ের মিছিলের থাকা নারীদের মনে রাখেনি। ইতিহাস জুলাইয়ে শ্রমিক, দিনমজুর, হকার, রিকশাওয়ালাদের প্রতিরোধের কথা মনে রাখেনি। যে ইতিহাস একটি গণ–অভ্যুত্থানকে গণমানুষের প্রতিরোধ থেকে ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে নিয়ে যায়, যে ইতিহাস শুধু সুযোগসন্ধানী আর ক্ষমতাসীনদের জুলাইয়ের একমাত্র হিস্যাদার মনে করে, যে ইতিহাস শহীদদের রক্তের বিচারের চেয়ে বেশি নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, সে ইতিহাসকে আমি প্রত্যাখ্যান করি।

জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষ। রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ। ধর্মের আগে মানুষ। লিঙ্গের আগে মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমিক, রিকশাচালক, হকার, দিনমজুর, গৃহিণী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষক, এমনকি পথচারী মানুষও কোনো না কোনোভাবে এই লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। যেসব মানুষ কোনো দিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হননি, যাঁদের ছবি ইতিহাসের বইয়ে ছাপা হবে না, তাঁরাও জুলাইকে নিজেদের কাঁধে বহন করেছেন। কেউ মিছিলে ছিলেন, কেউ আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, কেউ নিজের ঘরের দরজা খুলে দিয়েছেন, কেউ খাবার পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ তথ্য পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে থেকে সাহস দিয়েছেন। জুলাই ছিল জনগণের সম্মিলিত সাহসের প্রতিচ্ছবি। রাজপথে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রমাণ করেছিল, ক্ষমতার সবচেয়ে বড় উৎস শেষ পর্যন্ত জনগণই।

যে ইতিহাস একটি গণ–অভ্যুত্থানকে গণমানুষের প্রতিরোধ থেকে ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে নিয়ে যায়, যে ইতিহাস শুধু সুযোগসন্ধানী আর ক্ষমতাসীনদের জুলাইয়ের একমাত্র হিস্যাদার মনে করে, যে ইতিহাস শহীদদের রক্তের বিচারের চেয়ে বেশি নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, সে ইতিহাসকে আমি প্রত্যাখ্যান করি।
প্রাপ্তি তাপসী

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি, ইতিহাসকে সংকুচিত করার চেষ্টা হয়েছে। একটি গণ–অভ্যুত্থানকে কয়েকটি ব্যক্তির বীরত্বসূচক গল্পে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছে। মানুষের অংশগ্রহণকে ছোট করে দেখানো হয়েছে। নারীদের অবদানকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শিল্পীদের আঘাত করা হয়েছে। জুলাইকে অস্ত্র হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, শ্রমজীবী, লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষ, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা ইতিহাসের মূল বয়ান থেকে বাদ পড়তে শুরু করেছে। অথচ যেকোনো গণ–অভ্যুত্থানের শক্তি তার বহুত্বে। সেই বহুত্বকে মুছে ফেলা মানে জুলাইকেই অস্বীকার করা।

ছাত্রলীগ–যুবলীগের আক্রমণে আমরা কোনোভাবেই নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন এক অসমসাহসী নারী রিকশাচালক আমাদের আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ৪ আগস্ট দুপুরে যখন সামনে পুলিশের গুলি, কাঁদানে গ্যাসের শেল, রাবার বুলেট আর পেছনে আওয়ামী লীগের গুন্ডা সন্ত্রাসীরা; তখন কাঁটাবন মোড়ে এক অকুতোভয় মা তাঁর মেয়েকে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের খাবার আর পানি দিতে। প্রয়োজন পড়লে যেন আসতে পারি, তাই নিজের বাসাটাও চিনিয়ে দিয়েছিলেন।

কোনো গণ–অভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। রাষ্ট্র যদি পুরোনো অভ্যাসেই ফিরে যায়, তাহলে সেটিই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।

আমরা যদি সত্যিই শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধ হই, তাহলে আমাদের প্রথম দায়িত্ব হবে সত্যকে রক্ষা করা। সত্যকে দলীয় সুবিধার কাছে বিকিয়ে না দেওয়া। গণ–অভ্যুত্থানের চেতনাকে সংখ্যাগুরুর বয়ানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে না দেওয়া। বিচারকে রাজনৈতিক সমঝোতার কাছে বিসর্জন না দেওয়া। গণতন্ত্রকে শুধু একটি স্লোগান হিসেবে ব্যবহার না করা। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। কারণ, মানুষ জীবন দিয়েছিল একটি আদর্শ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য, নতুন কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরির জন্য নয়। জুলাইকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনায় সীমাবদ্ধ করলে তার প্রকৃত অর্থকে ছোট করা হবে। জুলাই ছিল মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।

জুলাইয়ের দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও গণ–অভ্যুত্থানের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার রাস্তায় আমরা অল্পই এগোতে পেরেছি। এখনো বিত্তশালীদের অপরাধ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, এখনো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হতে হয়, প্রতিনিয়ত বাউল-শিল্পীদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়, ভাইরাল না হলে লৈঙ্গিক বৈষম্য ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনার বিচার পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়, আইনের শাসন আর স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এখনো কল্পনাতীত। অথচ জুলাইয়ে আমাদের স্বপ্নই ছিল বৈষম্যমূলক এ কাঠামোর পরিবর্তন। সেই স্বপ্ন থেকে আমরা এখনো যোজন যোজন দূরে পিছিয়ে আছি।

১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসন এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের পর আমরা একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে আছি। বহু বছর পর এ দেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। এবার নিজেদের কাজে অভ্যুত্থানকারী প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর দায় সরকারের। সরকারকে মনে রাখতে হবে, বহু বছরের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মুখ চেপে ধরার রাজনীতি, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি আমাদের একটি অভ্যুত্থানের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। কাজেই জুলাই গণ–অভ্যুত্থান থেকে বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা যত দ্রুত শিক্ষা নেবেন, ততই তাঁদের জন্য মঙ্গল। আমাদের মনে রাখা দরকার, জুলাই ছিল মানুষের। আর মানুষের জুলাইকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

  • প্রাপ্তি তাপসী: নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সংগঠক