মুমিত আল রশিদ
মুমিত আল রশিদ

ইরানের মানুষ কখনোই স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়নি

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ইরান বরাবরই এমন একটি দেশ, যেখানে নারীরা ঘরে বন্দী কিংবা পর্দার অন্তরালে থাকে। অথচ আপনি যখন ইরানে যাবেন এবং রাজধানী তেহরানে প্রবেশমাত্রই বুঝতে পারবেন, আমাদের ভাবনা এবং সেখানকার সমাজ, রীতিনীতি, শিষ্টাচার পুরোপুরি বিপরীত। অফিস, আদালত, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় সর্বত্র নারীরা সদা তৎপর, বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত, এমনকি রাস্তায় আপনি ট্যাক্সি চালাতেও দেখবেন।

আমি ছয় বছর ধরে ইরানে ছিলাম পড়াশোনা করতে। ২০১৯ সালে ইরানের তেহরানের শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার পাণ্ডুলিপি শাখায় প্রাপ্ত ‘গুলদাস্তে গুলশানে মা’আনি’ নামে ফারসি মনোগ্রাফটি নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। সেখানে গিয়ে দেশটি সম্পর্কে অনেক ধারণাই পাল্টে যায়।

আমি ২০১৩ সালে ইরানে পিএইচডি প্রোগ্রামে যাই এবং তখন ১ ডলার সমান ২৯০০ তুমান (ইরানি মুদ্রা) ছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এটি ১ লাখ ৪০ হাজার তুমানে পৌঁছেছে।

ইরানের সামাজিক নিরাপত্তা ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। রাত–দিন ২৪ ঘণ্টা সেখানে নির্বিঘ্নে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যাওয়া যেত। আমি একজন বিদেশি হয়েও রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের কেরমান প্রদেশ, ৮০০ কিলোমিটার দূরের আহভাজ প্রদেশে একা একাই চলে গিয়েছিলাম।

ওই সময় মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থী সরকার হাসান রুহানি ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি আবার ইউরোপে পড়াশোনা করেছেন এবং তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ ছিলেন পাশ্চাত্যে পড়াশোনা করা লোক। তিনি ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। দুজনেই যথেষ্ট রুচিশীল এবং সাধারণ মানুষের চাহিদা বুঝতে সক্ষম ছিলেন, ফলে তাঁরা খুব দ্রুতই ছয় জাতি পরমাণু চুক্তি সম্পাদনে সক্ষম হয়েছিলেন। ইরানের মানুষ বেশ উৎফুল্ল ছিল, ছাত্রাবাসগুলোতে কেক দেওয়া হয়েছিল। ডলারের দামও তখন যথেষ্ট কমেছিল।

মূলত ডলারের মূল্য বৃদ্ধি শুরু হয়েছিল আহমাদি নেজাদ সরকারের সময় থেকে, এমনকি ইসরায়েল–সংক্রান্ত রেষারেষিও আহমাদি নেজাদ সরকারের সময় থেকেই বেশি মাত্রায় শুরু হয়।

২০১৬ সালের নির্বাচনে হাসান রুহানি আবারও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মরহুম ইব্রাহিম রাইসির চেয়ে প্রায় ৪ কোটি ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হলেন দ্বিতীয়বারের মতো। স্বভাবতই বেশ আশা–উদ্দীপনা ছিল জনগণের মাঝে; কিন্তু ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিয়ম হচ্ছে, একজন পরপর দুবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।

আর ইরানের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন রাহবার ইমাম খামেনি এবং তাঁর ১২ জন উপদেষ্টা মূলত তাঁকে বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

রাহবারের পরেই রয়েছে রাষ্ট্রের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যাঁরা সমপরিমাণ ক্ষমতার অধিকারী; পার্লামেন্টের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এবং প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট বহির্বিশ্ব সামলান।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় পরিবর্তন হয়, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের জন্য নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সময়ে মূলত পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে বেশ টানাপোড়েন শুরু হয়।

জারিফ এবং রুহানি সর্বাত্মক চেষ্টা করলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব-নিকাশ মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থীদের বেশ বেকায়দায় ফেলে দেয়।

মূলত ২০১৬ সালের নির্বাচনে হাসান রুহানির বিজয় লাভের পর পরবর্তী নির্বাচনে কট্টরপন্থী নেতা হিসেবে ইব্রাহিম রাইসিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভাবতে শুরু করেন ধর্মীয় নেতারা। এমনকি রাহবারের পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবেও তাঁকে ভাবা শুরু করেন।

বর্তমানের সমস্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বড় একটা সংকটও কিন্তু এখান থেকেই শুরু। ইরানের রাজনৈতিক জরিপে মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থী রাফসানজানি, খাতামি, হাসান রুহানির পক্ষে থাকায় সবার মধ্যেই একটি হতাশা কাজ করা স্বাভাবিক। যার ফলে আমরা দেখি যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, তখন প্রভাবশালী মধ্যপন্থী ও সংস্কারপন্থী অনেক প্রার্থীকেই নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।

মূলত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীর সর্বশেষ ধাপ অর্থাৎ কারা কারা নির্বাচন হতে পারবেন, এটি ১২ জন উপদেষ্টাই ঠিক করে দেন, যাঁরা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।

রুহানি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের মধ্যে আরও বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ভাব ছিল, কিন্তু রক্ষণশীল নেতারা বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে বেশ মনোযোগ দেন; যেমন সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনকেন্দ্রিক বিষয়ে নজর দেওয়ায় রুহানি সরকারও বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। এই সময়ে দৈনন্দিন জীবনে দ্রব্যমূল্য, মোরাল পুলিশিং এবং নারীদের প্রতিবাদ সামাজিক জীবনে অস্থিরতা তৈরি করে।

আমি নিজেও বড় বড় রাস্তার মোড়ে মোরাল পুলিশিং দেখেছি। তবে হাসান রুহানি মোরাল পুলিশিং ধারাটিকে অনেকটাই উদার করে দিতে চেয়েছিলেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রবেশপথে নারীদের জন্য বেশ কিছু বিষয় ছিল, বিশেষ করে কোমরের নিচ পর্যন্ত পোশাক পরিধান, আঁটসাঁট পোশাক পরিধান, হাতে নেলপালিশ, ঠোঁটে লিপস্টিক—এগুলো পর্যন্ত তদারকি করা হতো। তবে সেটি রুহানি সরকার থাকা অবস্থায় ধীরে ধীরে অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

ইব্রাহিম রাইসি ২০২১ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২২ সালে মাসা আমিনী হত্যাকাণ্ড, ২০২৩ সালে হামাস কর্তৃক গাজায় হামলা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের দাম হুহু করে বেড়ে যাওয়া, বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি সাধারণ মানুষকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দেয়।

প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল। এর মধ্যে ইরাকে ৬০ শতাংশ শিয়া–অধ্যুষিত। ফলে সেখানে ইরানের একটি বড় আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সিরিয়ায় ৬০ শতাংশ সুন্নি, এখানে কুর্দিরা রয়েছে, শাফেয়ি মাজহাবও রয়েছে, সেই সঙ্গে রয়েছে উদারপন্থী আলাভি জনগোষ্ঠী। তারা এই অঞ্চলে ইরানের আধিপত্য ও প্রভাব খুব বেশি মেনে নিতে পারেনি; কেননা এদের সবাই দিন শেষে আরব রক্ত। ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সখ্য সৌদি-ইরান সম্পর্কে বেশ ফাটল ধরায়। লেবাননে হিজবুল্লাহকে সমর্থন ওই দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছুটা হলেও বিরূপ মনোভাব তৈরি করে। ওই অঞ্চলের মানুষগুলোর মধ্যে অনেক সময় দেখেছি ধর্মীয় উদ্দীপনার চেয়ে জাতীয়তা অধিক কাজ করেছে।

ইরানের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ফারসি ভাষার যে উৎকর্ষ আজ বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান, সেটি কিন্তু কোনোভাবেই ধর্মীয় কট্টরতার শিক্ষা দেয় না; বরং আমরা যদি বলি উদার, আধ্যাত্মিক মনন, মানবিকতা, নৈতিক উৎকর্ষ সাধন, সেগুলো সব কটির ধারক–বাহক হচ্ছে ফারসি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। তারা কখনোই ধর্মীয় গোঁড়ামিকে পাত্তা দেয়নি।

বর্তমানে যাঁরা কবি-সাহিত্যিক রয়েছেন, তাঁরা সবাই আধুনিক ঘরানার এবং ইউরোপের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা। সচরাচর তাঁরা সব ধরনের গোঁড়ামি, স্বৈরাচারী মনোভাব এবং ধর্মীয় কট্টরবাদিতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তবে সাহিত্যের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে প্রতীকী অসংখ্য শব্দ ব্যবহার করা যায়, যেগুলো প্রচ্ছন্নভাবে বা পরোক্ষভাবে স্বৈরাচারের নানাবিধ কর্মকাণ্ডকে সমালোচনার তিরে বিদ্ধ করা যায়; কিন্তু সিনেমায় কোনো না কোনোভাবে সরাসরি সেটি চলে আসে। ফলে আমরা দেখি জাফর পানাহি, মহসিন মখমলবাফ ও আসগর ফারহাদির মতো বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকারেরা দেশের বাইরে থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে বাধ্য হয়েছেন।

ইরানের ক্ষমতার আশপাশে যাঁরা রয়েছেন অথবা যাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে সাহিত্যিকদের সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হয়েছেন এবং এ কারণে অসংখ্য সাহিত্যিক, লেখক একেবারে ফাঁসির কাষ্ঠে পর্যন্ত গিয়েছেন। সাহিত্যের সূচনা থেকে বর্তমান পর্যন্ত জেল–জরিমানা জুলুমের শিকার হয়েছেন কবি-সাহিত্যিকেরা। বর্তমানেও এর ব্যতিক্রম নয়।

ইরানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় সবাই স্বাধীনচেতা এবং তাঁদের শিক্ষাজীবনের লক্ষ্য–উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে তৈরি করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা করা এবং এ কারণে তাঁরা প্রতিবাদে মাঝেমধ্যেই সোচ্চার হোন এবং ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল এমনকি গত কয়েক বছরে টানা বেশ কয়েকটি আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি ছিল।

ইরানি শিক্ষার্থীদের আরেকটি জিনিস আমি প্রত্যক্ষ করেছি সেটি হচ্ছে, পড়াশোনার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে তাঁরা রাজনীতি থেকে একেবারেই দূরে থাকেন।

ইরান কোনোভাবেই, কোনো সরকারের আমলেই নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়নি। সেই খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের আলেকজান্ডার দি গ্রেট থেকে শুরু করে হজরত ওমর (রা.)–এর সময়ে পারস্যে ইসলাম আগমন, চেঙ্গিস খানের ইরান আক্রমণের পরও এই প্রজন্ম তাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, উৎসবের মিশ্রণ ঘটিয়েছে পারস্য সভ্যতার আদলে। কিন্তু কখনোই নিজেদের স্বকীয়তা বিসর্জন দেয়নি। আমরা যদি দেখি অধিকাংশ তরুণ তাদের মেধার বিকাশ ঘটিয়েছে স্বাধীনচেতা মনোভাবে থেকেই এবং নিজেদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চেয়ার থেকে দূরে সরিয়ে। তারা দিন শেষে স্বাধীনচেতা হিসেবেই নিজেদের দেখতে চায়। দেশের স্বার্থে তারা সবাই এক এবং ঐক্যবদ্ধ।

তাদের ভাষা হচ্ছে, ‘প্রত্যেক মজলুমেরই খোদা রয়েছে। খোদা কারও একক ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ধর্ম, সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং শিল্পের অনবদ্য মিশ্রণে পারস্য সভ্যতা আজও টিকে আছে এবং তারা সেভাবেই তাদের দেশকে দেখতে চায়।’

[মুমিত আল রশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান]