
দুলাল মিয়ার বয়স ৬৬। রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় কাঁধে পানি নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেন তিনি। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও ছেলেদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে এই ভার বহন করে চলেছেন তিনি। কারণ, তিনি থেমে গেলে ছেলেদের পড়ালেখার স্বপ্নও থেমে যাবে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দুলাল মিয়ার দেখা পাই কোতোয়ালি থানার বেশ কিছুটা সামনে। কাঁধে পানির পাত্র ঝুলিয়ে ছুটছেন। মাথার ওপর কাঠফাটা রোদ আর পানির ভারে শরীর যেন সড়কের সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। তবু থামছেন না তিনি।
দুলাল মিয়ার পিছু নিয়ে বেশ খানিকটা পথ এগোলাম। দেখা গেল, ওয়াইজঘাট এলাকার সড়কের পাশের খাবারের একটি ছোট দোকানে পানিটা পৌঁছে দিলেন তিনি। সেখানেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
দুলাল মিয়া বলেন, কোতোয়ালি থানার সামনে থেকে ডিপ কলের পানি সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর তা বয়ে নিয়ে যেতে হয় ওয়াইজঘাট, বাকল্যান্ড বাঁধ; আবার কখনো বাদামতলী পর্যন্ত। এভাবেই কেটেছে তাঁর জীবনের ৩৭টি বছর। এত বছর ধরে পানি বওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছে তাঁর শারীরিক গঠনও। কাঁধের কাছ থেকে কুঁকড়ে কুঁজো হয়ে গেছেন তিনি।
প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি দোকানে পানি পৌঁছে দেন দুলাল মিয়া। বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি লম্বা লাঠির দুই পাশে দড়ি দিয়ে ঝোলানো দুটি টিনের পাত্র। দুটি পাত্রে ২০ লিটার করে মোট ৪০ লিটার পানি একসঙ্গে বয়ে চলেন তিনি। প্রতিবার পানি পৌঁছে দিলে ৩০ টাকা করে পান। বললেন, ‘যতক্ষণ লাগে আইনা দিই। না লাগলে আবার বইয়া থাহি।’ এভাবে কত টাকা আয় হয় জানতে চাইলে বলেন, ‘চাইর–পাঁচ শ টাকা হইয়া যায়।’
বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জে এক কক্ষের বাসায় ভাড়া থাকেন দুলাল মিয়া। মাসে ভাড়া দিতে হয় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে চলে আসতে হয় সদরঘাটে; আর বাড়িতে ফেরেন কোনো দিন ১১টা কোনো দিন ১২টা। নৌকায় করে পারাপার হতে খরচ হয় ১০ টাকা।
এখন বয়স হয়েছে, কষ্ট হয়। তার পরও বললেন, ‘কাম কইরা খাই। চুরি করলে ইজ্জত যাইব। ধরা খাইলে মাইর খাইব। কী দরকার। আল্লা যেভাবে চালায় সেভাবে চলি।’
দুলাল মিয়ার এই সংগ্রামের দুই কারণ। প্রথমটি হলো তাঁর তিন সন্তান লেখাপড়া করে। তিনি বলেন, ‘পোলারা পড়ালেখা করে। এ জন্য কাজ করতে হয় কষ্ট কইরা। আমি যদি কাম না করি, তাইলে তো ওগো পড়ালেখা বন্ধ হইয়া যায়।’
তিন বছর আগে জটিল অসুখে ভুগে দুলাল মিয়ার স্ত্রী মারা গেছেন। সে সময় স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে তিন লাখ টাকার মতো ঋণ হয়েছিল দুলাল মিয়ার। সেই ঋণ এখনো শোধ করতে পারেননি তিনি। বললেন, ‘যে টাকা আয় হয়, তা দিয়েই টানাটানি হয়। ঋণ শোধ করতে পারি না। পারি না বিধায় তো কষ্ট হয়। পোলাগোর পড়ালেখা করাইতে না হইলে তবু পারতাম।’
এত কিছুর পরও জীবন নিয়ে অভিযোগ নেই দুলাল মিয়ার। বললেন, ‘আল্লা যেভাবে যখন রাখে। আমার তো করার কিছু নাই। আল্লার উপরে ভরসা। কামডা করতে কষ্ট হয়। তার পরও করার কিছু নাই।’
‘কষ্টে আছি’
দুলাল মিয়া যে ঘাট দিয়ে পারাপার করেন, সে ঘাটেই নৌকা চালান ইউনুস হাওলাদার। বয়স ৫৫ পেরিয়েছে। ২০ বছর ধরে ওয়াইজঘাটে নৌকা বাইলেও নিজের একটি নৌকা কিনতে পারেননি। চালান ভাড়ার নৌকা।
ইউনুসের সঙ্গে বৃহস্পতিবার কথা হয় ওয়াইজঘাটে। প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে শুরু হয় তাঁর জীবনযুদ্ধ। দাঁড় টেনে যেতে হয় গভীর রাত পর্যন্ত। তবে যতটা পরিশ্রম, ততটা আয় হয় না বলে জানান তিনি। বললেন, ‘একেকবারে চাইরজন লইয়া পারাপারি করি। ১০ টেকা কইরা ভাড়া। সব সময় লুক পাওয়া যায় না। একজন–দুইজন লইয়াও পার হওয়া লাগে।’
স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কেরানীগঞ্জে ভাড়া থাকেন ইউনুস হাওলাদার। ভাড়া দিতে হয় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। সংসার কীভাবে চলছে জানতে চাইলে বলেন, ‘কষ্টে আছি। খরচ বাড়তাছে। আয় আগের মতন নাই।’