বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা শেষে ভোরের আলো ফোটার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ফুটবলপ্রেমীদের ভিড়। ২০ জুলাই, ২০২৬
বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা শেষে ভোরের আলো ফোটার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ফুটবলপ্রেমীদের ভিড়। ২০ জুলাই, ২০২৬

‘মনে হচ্ছিল স্পেনের জার্সি পরে ব্রাজিল নেমেছে!’

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার বিপুল সমর্থকগোষ্ঠীর যে বাঁধভাঙা উল্লাস দেখার জোর প্রত্যাশা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা দীর্ঘশ্বাসে রূপ নিল। ফাইনালের বাঁশি বাজার আধঘণ্টা পর টিএসসিতে দেখা গেল এক অন্য রকম চিত্র। যে উচ্ছ্বাস নিয়ে শুরু হয়েছিল খেলা দেখা, তা গড়াল হতাশায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্থানীয় সময় রোববার ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলটি যখন আর্জেন্টিনার জাল ছুঁয়ে গেল, টিএসসির অধিকাংশ দর্শকের মুখেই তখন অন্ধকার। সব মিলিয়ে যেমনটা অনুমিত ছিল, সেটাই দেখা গেছে—স্পেনের বিশ্বজয়ের রাতে টিএসসিতে উৎসবের চেয়ে বিষাদের সুরই চোখে পড়েছে বেশি।

সরগরম টিএসসির গল্প

মধ্যরাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলেও টিএসসিতে ফুটবলপ্রেমীদের আনাগোনা কমেনি। রাজু ভাস্কর্যের চারপাশ যেন ছেয়ে যায় নীল-আকাশি রঙে। তবে সেই নীল-সাদার ফাঁকফোকরে লাল–হলুদ জার্সি গায়ে দু-একজন ‘গর্বিত’ স্পেন সমর্থকেরও দেখা মিলছিল। চারপাশের স্ট্রিটফুডের কার্ট ও চায়ের স্টলগুলোয় ছিল রমরমা আড্ডা। চোখ পড়েছে ‘পাঞ্চ মেশিন’ ঘিরে থাকা দর্শকদের ভিড়ের দিকেও। আর ফুটবলপ্রেমীদের ম্যাচ-পরবর্তী চুলচেরা বিশ্লেষণ চলেছে ভোর পেরিয়ে পুরো আলো ফোটার পর পর্যন্ত।

সাধারণ দর্শকদের পাশাপাশি বেশি ব্যস্ত সময় পার করছিলেন বিভিন্ন ইউটিউবার, ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকেরা। হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে তাঁরা রাতভর দর্শকদের কাছ থেকে নানা রকমের প্রতিক্রিয়া নিচ্ছিলেন। কেউ কেউ আবার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যকার চিরচেনা কপট-কলহ, রেষারেষি আর কৌতুকপূর্ণ তর্কাতর্কির দৃশ্যগুলো ক্যামেরাবন্দী করছিলেন।

স্পেনের জয়ের পর টিএসসিতে এক নারী সমর্থকের সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়া নিচ্ছেন বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকেরা। ২০ জুলাই, ২০২৬

খেলা শেষে ভিড়ের মধ্যে দেখা গেল নোয়াখালীর বাসিন্দা ও পেশায় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে। তাঁর কাঁধে জড়ানো ফিলিস্তিনের পতাকা। বললেন, তিনি ব্রাজিলের সমর্থক হলেও আজকে স্পেনকে সমর্থন দিয়েছেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্পেনের উদীয়মান তারকা লামিনে ইয়ামালকে আমার খুব ভালো লাগে। তা ছাড়া ফিলিস্তিনকে স্পেন সব সময় যেভাবে নৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে, সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই আজ আমার এই পতাকা নিয়ে স্পেনের পক্ষে দাঁড়ানো।’

স্পেনের বিশ্বজয়ের পর টিএসসিতে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে স্পেনের এক সমর্থক। ২০ জুলাই, ২০২৬

স্পেনের জয়ের রাতে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ব্যবসায়ী ইমন আহমেদ টিএসসিতে আসেন স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে। তিনি জানান, তাঁর স্ত্রী আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত। ইমন আহমেদ হাসিমুখে বলছিলেন, ‘ও আর্জেন্টিনার কড়া সমর্থক। দল হেরে যাওয়ার পর ওর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই ভাবলাম ঘরে মুখ ভার করে বসে থাকার চেয়ে টিএসসির থেকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি, মনটা অন্তত ভালো হবে।’

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী মৃদু হেসে বললেন, ‘আজকের ম্যাচে আর্জেন্টিনা প্রথম থেকেই তেমন ছন্দে ছিল না। তবে পরেরবার আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরব।’

আর্জেন্টিনার হারের পর স্ত্রীর বিষণ্ন মন ভালো করতে একমাত্র সন্তানসহ সপরিবার টিএসসিতে এসেছেন চকবাজারের ইমন আহমেদ। ২০ জুলাই, ২০২৬

রাজু ভাস্কর্যের নিচে বসে ছিলেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বাসিন্দা ও মিডিয়াকর্মী প্রান্ত জোসেফ গোমেজ। মন ভাঙার যন্ত্রণা ধরা দিল তাঁর কণ্ঠে, ‘ভীষণ আশা নিয়ে টিএসসিতে এসেছিলাম ম্যাচটা দেখতে। পুরো টুর্নামেন্টে ছেলেরা দারুণ খেলে আজ ফাইনালে এসেছিল। কিন্তু আজকে ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল না।’

টিএসসিতে রাজু ভাস্কর্যের কাছে মুখে ‘জোকার’–এর রং মেখে সবার নজর কাড়ছিলেন এক ফুটবলপ্রেমী তরুণ। ২০ জুলাই, ২০২৬

ছিলেন স্পেনের সমর্থকেরাও

টিএসসিতে যে কেবল আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের সমর্থকদেরই একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তা নয়। দীর্ঘদিন ধরে স্পেনের নান্দনিক ফুটবলকে ভালোবেসে সমর্থন করা সমর্থকদেরও দেখা মিলেছে সেখানে। তেমনই প্রিয় দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য আর পারিবারিক আবেগের গল্প শোনালেন তানভীর হাসান এবং তাঁর বাবা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের এই শিক্ষার্থী স্পেনের খেলা দেখে টিএসসিতে এসেছিলেন তাঁর বাবার সঙ্গে। দুজনের গায়েই জড়ানো ছিল স্পেনের জার্সি। তানভীর হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার, এমনকি পোষা বিড়ালটিও আজকে স্পেনের জার্সি পরে খেলা দেখেছে!’

স্পেনের বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক রাতে টিএসসি চত্বরে পতাকা হাতে বুয়েট শিক্ষার্থী তানভীর হাসান ও তাঁর বাবা। ২০ জুলাই, ২০২৬

ছেলের কথার সূত্র ধরে তানভীরের বাবা স্মৃতিচারণা করলেন, ‘২০১০ সালের বিশ্বকাপের সময় ও যখন মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের শিশু, তখন রাত তিনটায় ওকে কোলে নিয়ে টিএসসিতে এসেছিলাম স্পেনের ফাইনাল দেখতে। সেবার স্পেন জিতেছিল। ও পরের দিন স্পেনের জার্সি পরেই স্কুলে গিয়েছিল। সেই থেকেই স্পেনের প্রতি ওর এই ভালোবাসা।’

কথায় কথায় আরেকটি স্মৃতির কথাও মনে করিয়ে দিলেন তানভীরের বাবা, ‘আমি কিন্তু একই সঙ্গে লিওনেল মেসিরও ভক্ত। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা দল যখন ঢাকায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে খেলতে এল, তখন এই ছেলেকে নিয়ে গ্যালারিতে বসে মেসির খেলা দেখেছিলাম। সেই স্মৃতি আজও ভুলিনি।’

বেসরকারি চাকরিজীবী আবুল খায়ের কোমলের সেই ২০০৮-১০ সাল থেকে স্পেনের সমর্থক। ম্যাচ শেষে খানিকটা বিশ্লেষণের ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘আজকের ম্যাচটা একপেশে হতে পারত, কিন্তু আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমি মার্তিনেজ যেভাবে অতিমানবীয় ১২টি সেভ করলেন, তা খেলাটিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পেনের নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ফুটবল ও পাসিং গেমের কাছে আর্জেন্টিনাকে হার মানতেই হলো। যেভাবে স্পেন ফ্রান্স কিংবা ফ্রান্সের ওলিসেকে প্যাক করে রেখেছিল, আজও তাদের ডিফেন্স সে কাজই করেছে।’

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে টিএসসিতে খেলা দেখতে এসেছিলেন তাঁরা

ব্রাজিলের কট্টর সমর্থক হয়েও আজ স্পেনের পক্ষে গলা ফাটিয়েছেন বেইলি রোড থেকে আসা তরুণ কণ্ঠশিল্পী রিজভী লোটাস। রসিকতা করে তিনি বলছিলেন, ‘আজকে মাঠে স্পেন যেভাবে খেলছিল, মনে হচ্ছিল যেন ব্রাজিলই স্পেনের জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছে! ব্রাজিল তো এবার আগেই বিদায় নিয়েছে, তাই আজ মন খুলে স্পেনের সুন্দর ফুটবল উপভোগ করেছি।’

টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আর্জেন্টিনার দুই ভক্তের মাঝে হাস্যোজ্জ্বল একজন ব্রাজিল সমর্থক

একই সুর শোনা গেল ওয়ারীর ব্যবসায়ী ইমন আহমেদের কণ্ঠেও। তিনি তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছিলেন। বললেন, ‘আমরা ব্রাজিলের সমর্থক হলেও ফুটবলকে ভালোবাসি। লামিনে ইয়ামালের মতো তরুণদের খেলা দেখতে ভালো লাগে, তাই আজ স্পেনের জয়ে দারুণ খুশি।’

দুই সন্তানকে নিয়ে ওয়ারী থেকে টিএসসিতে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে এসেছিলেন ব্যবসায়ী ইমন আহমেদ। স্পেনের বিশ্বজয়ের পর রাজু ভাস্কর্যের সামনে এভাবেই সন্তানদের নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন তিনি। ২০ জুলাই, ২০২৬

ভোরের আলো ফুটতেই কমতে শুরু করে ভুভুজেলার আওয়াজ। সাদা-আকাশি জার্সির সমর্থকেরা তখন টিএসসি ছাড়ছিলেন; বিমর্ষবদনে, আর একজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন আরেকজন। সান্ত্বনার ভাষাটি ছিল ব্যবসায়ী ইমন আহমেদের স্ত্রীর কথাটির মতো—‘পরেরবার আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরব।’