চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কবিখালী গ্রামে বিশাল সৌর প্যানেলের সামনের জমিতে ব্যস্ত কৃষক। এখানে সৌরশক্তিতে সেচ পরিচালিত হয়
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কবিখালী গ্রামে বিশাল সৌর প্যানেলের সামনের জমিতে ব্যস্ত কৃষক। এখানে সৌরশক্তিতে সেচ পরিচালিত হয়

কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা, উদ্যোগ কম

সৌরচালিত সেচব্যবস্থা বর্তমানে দেশের মোট সেচকৃত জমির ১ শতাংশের মতো। বাকিটা এখনো ডিজেলচালিত ও গ্রিড-সংযুক্ত বৈদ্যুতিক পাম্পের ওপর নির্ভরশীল।

বোরো ধানের মৌসুম এলেই তাইজুল ইসলামের চিন্তা বেড়ে যেত। বোরোর আবাদ হয় শুকনা মৌসুমে। তখন বৃষ্টির পানি থাকে না। দেশের বেশির ভাগ এলাকার মতো তাইজুলদের এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিই ভরসা। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ধীতপুরে।

তাইজুলের জমিতে সেচের কাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডিজেল। কয়েকজন কৃষক মিলে পানি তোলার যন্ত্র কিনলেও ডিজেল পাওয়া, শহর থেকে এনে মজুত করা আর প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা দামের সঙ্গে তাল মেলানো ছিল কঠিন। ঠিক সময়ে পানি দিতে না পারলে অনেক সময় ফেটে যেত জমির মাটি। জ্যৈষ্ঠের দুপুরে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তাঁর সঙ্গে দেখা। তাইজুল বলেন, ‘ত্যালের দামের ঠিকঠিকানা নাই। কহন বাড়ে, কহন কমে। ধানে সময়মতো পানি দিতে না পারলে মাটি ফাইটা যাইত।’

তেল নিয়ে সংকটের এই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে ভালুকার ধীতপুর এলাকায়। ধীতপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুতিয়া নদীর পানি এখন সৌরশক্তির সাহায্যে তোলা হচ্ছে কৃষিজমি সেচের জন্য। তাইজুলের মতো অন্তত ৭০ জন কৃষক সেই সুবিধা পাচ্ছেন। এই সোলার পাম্প শুধু নয়, একই ব্যবস্থার আওতায় কৃষকেরা পাচ্ছেন হলার (ধান ভাঙানোর যন্ত্র), সোলার ড্রায়ার (ধান শুকানোর যন্ত্র), সৌরচালিত মাড়াই যন্ত্র। এসবের পাশাপাশি আছে ছোট আকারের হিমাগার। এতে দুই টন শস্য রাখা সম্ভব। সেই হিমাগারও চলবে সৌরশক্তিতে। তাইজুল বলছিলেন, ‘এক জায়গায় ম্যালা সুবিধা।’

সুবিধার আরও একটি দিক হলো, এখানে আছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর জন্য সৌরচালিত চার্জিং ব্যবস্থা। পণ্য আনা-নেওয়ার সুবিধার জন্য এটা করা হয়েছে।

তবে সেচসুবিধা চালু হলেও অন্য সুবিধাগুলো এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। এখানে সৌরচালিত সেচসুবিধা শুরু হয়েছে ২০২২ সালে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এটি চালু করে। এখন অন্য যে সুবিধাগুলো চালু হয়েছে, তা যৌথভাবে করছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগ এবং যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম সিটি ইউনিভার্সিটি। এ কাজেও সহায়তা করছে বিএডিসি।

ত্যালের দামের ঠিকঠিকানা নাই। কহন বাড়ে, কহন কমে। ধানে সময়মতো পানি দিতে না পারলে মাটি ফাইটা যাইত।
তাইজুল ইসলাম, কৃষক

ধীতপুরে প্রায় ৭ শতাংশ জমিতে ছড়িয়ে আছে সৌর প্যানেলগুলো। এই প্যানেল থেকে ১৭ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, দেশীয় উপকরণে তৈরি হওয়ায় এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবহারবান্ধব। এমন প্রযুক্তি কৃষিপণ্যের অপচয় কমাতে পারে, পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও বাড়াতে পারে। সেচের ক্ষেত্রে কী সুবিধা হয়েছে, জানতে চাইলে এ এলাকার বাসিন্দা রুকুনুজ্জামান বলেন, ‘আগে সেচের জন্য কৃষকের কাঠাপ্রতি যাইতো আষ্ট শ ট্যায়া। এহন তিন শ ট্যায়া লাগে। যুদি জমির পরিমাণ বেশি অয়, খরচ আরও কমব।’

ধীতপুরের এ উদ্যোগ দেশের কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সৌরশক্তিনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনো মোট জ্বালানি ব্যবস্থার তুলনায় সীমিত। তবে কৃষিক্ষেত্রে সৌরশক্তিচালিত সেচ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার মতো উদ্যোগগুলো দেখাচ্ছে, গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধীতপুরের তাইজুল ইসলামের মতো কৃষকদের অভিজ্ঞতা সেই পরিবর্তনেরই একটি বাস্তব চিত্র।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক চয়ন কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের এই উদ্যোগ একটি মডেল হতে পারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রে সৌরশক্তি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মূলত সেচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ধীতপুরের এই কেন্দ্রে সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে জমিতে সেচ দেওয়া থেকে শুরু করে ধান মাড়াই ও শুকানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার কমবে, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষির টেকসই উন্নয়ন হবে।

কৃষকেরা সরাসরি এই খরচ বহন করেন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে মাঠে। ডিজেলের দাম বাড়লে বাড়ে সেচ খরচ, সেচ খরচ বাড়লে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়, আর শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে খাদ্যের দামে। তাই কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি শুধু পরিবেশের নয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিরও প্রশ্ন।

ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল সেচব্যবস্থা

দেশের কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী খাত হলো সেচ। বোরো ধান, সবজি, ভুট্টা কিংবা অন্যান্য রবি ফসল—সব ক্ষেত্রেই শুষ্ক মৌসুমে সেচের প্রয়োজন হয়। সেই সেচব্যবস্থার বড় অংশ এখনো নির্ভর করে ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মোট ১৫ লাখ ৮২ হাজার ৩৫৪টি সেচযন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ-চালিত সেচযন্ত্র ছিল ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৭টি, আর ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ছিল ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৫০৭টি। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে ৫৩ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে সেচ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচযন্ত্রই ডিজেলনির্ভর।

এই নির্ভরতার অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। স্রেডার হিসাব অনুযায়ী, একটি ডিজেলচালিত সেচপাম্প বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ লিটার জ্বালানি ব্যবহার করে। সে হিসাবে দেশের সেচ খাতে বছরে প্রায় ১৪ হাজার ৯১৬ লাখ লিটার ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ওজনে যা প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টন। এই ডিজেল আমদানিতে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা।

কৃষকেরা সরাসরি এই খরচ বহন করেন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে মাঠে। ডিজেলের দাম বাড়লে বাড়ে সেচ খরচ, সেচ খরচ বাড়লে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়, আর শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে খাদ্যের দামে। তাই কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি শুধু পরিবেশের নয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতিরও প্রশ্ন।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বেশ কয়েকটি উৎস আছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌরশক্তি, বায়ু, পানি, বায়োগ্যাস, বায়োমাস (গোবর, ধানের তুষ, খর, পাটকাঠি ইত্যাদি)। কিন্তু এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে সৌরশক্তি। স্রেডার তথ্যমতে, এখন যেসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তার ৮৩ শতাংশই আসে সৌরশক্তি থেকে। এসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ আসে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। 

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলচালিত ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৬৩৯টি অগভীর নলকূপ (শ্যালো টিউবওয়েল), ৭৩৭টি গভীর নলকূপ (ডিপ টিউবওয়েল) এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৭৫টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে মোট ১২ লাখ ২০ হাজারের বেশি সেচযন্ত্র চালাতে প্রায় ৭ লাখ ৬৯ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়েছে।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বেশ কয়েকটি উৎস আছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌরশক্তি, বায়ু, পানি, বায়োগ্যাস, বায়োমাস (গোবর, ধানের তুষ, খর, পাটকাঠি ইত্যাদি)। কিন্তু এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে সৌরশক্তি। স্রেডার তথ্যমতে, এখন যেসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তার ৮৩ শতাংশই আসে সৌরশক্তি থেকে। এসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ আসে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। 

এ ক্ষেত্রে যারা কাজ করে

দেশের কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখন পর্যন্ত অনেক কম হলেও প্রায় পুরোটাই সেচ খাতে। ময়মনসিংহের ভালুকার মতো এমন পরীক্ষামূলক প্রকল্প কিছু কিছু জায়গায় চলছে। তবে সেগুলো বড় আকারে হয়নি। সেচের কাজে সৌরপাম্পের ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্তত নয়টি সরকারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এখন কাজ করছে। এসব প্রতিষ্ঠান হলো বিএডিসি, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট একাডেমি এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমি। 

বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের অধীন এখন ৫ হাজার ১৩৯টি সেচের জন্য সৌরপাম্প আছে। সেখানে উৎপাদিত হয় ৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। 

দেশে সেচের আওতায় থাকা জমির মোট পরিমাণ প্রায় ৫৫ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। সে হিসাবে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা বর্তমানে দেশের মোট সেচকৃত জমির ১ শতাংশের মতো এলাকায় পৌঁছাতে পেরেছে। বাকি বিপুল অংশের সেচ এখনো ডিজেলচালিত ও গ্রিড-সংযুক্ত বৈদ্যুতিক পাম্পের ওপর নির্ভরশীল।

দেশে সৌর সেচের সুবিধার কথা বলতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিতে পানি তোলার কাজ সাধারণত দিনের বেলাতেই হয়। আর দিনের বেলাতেই সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সৌর প্যানেল। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে এটি একটি স্বাভাবিক সমন্বয়। দেশের অধিকাংশ এলাকায় বছরে প্রায় ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। 

আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের (আইডব্লিউএমআই) এক গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরচালিত সেচপাম্প বাংলাদেশের কৃষকদের সেচ ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে আমদানিকৃত ডিজেলের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৬ লাখ সেচপাম্পের ৮০ শতাংশ এখনো ডিজেলচালিত। গ্রিড-সংযুক্ত সৌর সেচব্যবস্থা এবং উপযুক্ত নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এসব মডেল স্থানীয় সেবা প্রদানকারীদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের সুযোগও সৃষ্টি করছে। আইডব্লিউএমআই দেশে সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ নিয়ে কাজ করছে। আইডব্লিউএমআইয়ের সহযোগী বিজ্ঞানী জয়ন্ত ভট্টাচার্য্য বলেন, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে পানি সংরক্ষণে উৎসাহ দেওয়ার জন্য সৌর সেচের সঙ্গে অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) কৌশলকে যুক্ত করা হচ্ছে। এই কৌশলগত সমন্বয়ের লক্ষ্য হলো প্রতি ফোঁটা পানিতে ফসলের পরিমাণ সর্বোচ্চ করা এবং একই সঙ্গে ধানখেত থেকে মিথেন গ্যাস নির্গমন ব্যাপকভাবে হ্রাস করা। বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য ও পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীলনকশা হিসেবে দেখছেন।

ভালুকার ধীতপুরে দেশীয় প্রযুক্তিতে বানানো হয়েছে ধান ভাঙানোর মেশিন। আর এ মেশিন চলবে সৌরশক্তিতে

শুধু সেচ নয়, একটি নতুন অর্থনীতি

সৌরশক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ছাদে সৌর প্যানেলের কথা সামনে আসে। কিন্তু কৃষিতে সৌরশক্তির ব্যবহার যে আরও বিস্তৃত হতে পারে, ধীতপুরের প্রকল্পটি তার একটি ইঙ্গিত দেয়।

কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং বাজারে পৌঁছে দেওয়া। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংগ্রহ-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও সংরক্ষণের অভাব, কোথাও শুকানোর ব্যবস্থা নেই, আবার কোথাও বিদ্যুতের অভাবে ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব হয় না।

ধীতপুরের উদ্যোগটি এই পুরো সমস্যাকে একসঙ্গে দেখার চেষ্টা করেছে। এখানে শুধু সেচের জন্য সৌরশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে না, একই অবকাঠামো ব্যবহার করে ধান শুকানো, মাড়াই, সংরক্ষণ এবং পরিবহনব্যবস্থাকে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। ছোট আকারের সৌরচালিত কোল্ডস্টোরেজ হচ্ছে দিনাজপুর, ঝিনাইদহসহ কয়েকটি এলাকায়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলছেন, কৃষিকে যদি সত্যিকার অর্থে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতায় আনতে হয়, তাহলে সেচের বাইরে যেতে হবে। কৃষকের জমি থেকে পণ্য বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ভ্যালু চেইন বিবেচনায় নিতে হবে।

ইডকলের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশে সৌর সেচের বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রাষ্ট্রায়ত্ত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ইডকল। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিডবহির্ভূত গ্রামীণ এলাকায় সেচসুবিধা পৌঁছে দেওয়া, ডিজেলের ব্যবহার কমানো এবং কৃষকের খরচ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে তারা সৌর সেচ কর্মসূচি শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো নয়, বরং কৃষিকে আমদানি করা জ্বালানির দামের ওঠানামা থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া।

ইডকল সূত্র জানায়, ১৫ থেকে ২০ বিঘার জমির সেচসুবিধার জন্য একটি সৌরপাম্প স্থাপনে ১২ লাখ টাকার মতো ব্যয় হয়। আর ১২০ বিঘার মতো জমির জন্য নির্মাণে খরচ পড়ে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে আবার যে জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপিত হয়, তার খরচও যুক্ত থাকে।

ইডকলের মডেলটি মূলত অংশীদারভিত্তিক। খরচের ৩৫ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেয় ইডকল। বাকি অংশ ব্যাংক গ্যারান্টি এবং কৃষকদের নিজেদের বহন করতে হয়৷ ঋণের বাইরেও ইডকল সৌর সেচব্যবস্থা স্থাপনের জন্য ৫০ শতাংশ অনুদান দেয়। এই সুবিধা না থাকলে অধিকাংশ কৃষকের পক্ষে সৌর সেচে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হতো।

তবে এখনো ইডকলের অগ্রযাত্রার গতি ধীর। ইডকল ২০১১ সালে জানিয়েছিল, ২০১৬ সালের মধ্যে সারা দেশে তারা ১৮ হাজার ৭৫০টি সৌর পাম্প স্থাপন করবে। এরপর বারবার লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে সর্বশেষ ২০৩০ সাল নাগাদ ১০ হাজার ডিজেল পাম্প সৌরশক্তিতে রূপান্তরের কথা বলছে।

এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক অর্থায়ন অনেক কমে গেছে। ইডকলের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। আর সরকারের বিভিন্ন দপ্তর যেমন বার্ষিক বাজেট থেকে অর্থ পায়, ইডকল তা পায় না। ইডকলের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) নাজমুল হক ফয়সল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করছি।’

এডিবির রোডম্যাপ অনুযায়ী, বড় পরিসরে সৌর সেচপাম্প স্থাপন করা গেলে বছরে কয়েক লাখ টন ডিজেল সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমবে না, একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।

অর্থনীতির হিসাবে কতটা লাভ

প্রথম আলোর চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি শাহ আলম জানান, এ বছর বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের সংকটে চুয়াডাঙ্গাজুড়ে ফিউয়েল স্টেশনগুলোতে হাজারো কৃষককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় সেচ না পাওয়ায় অনেকের ফলনও আশানুরূপ হয়নি। তবে সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের সরিষাডাঙ্গা-কবিখালী গ্রামের কৃষকেরা এ সংকটের প্রভাব তেমন অনুভব করেননি। সৌর সেচপাম্পের কারণে তাঁরা নিরবচ্ছিন্ন সেচসুবিধা পেয়েছেন এবং ভালো ফলনও হয়েছে।

কবিখালী গ্রামের কৃষক রেজাউল করিম বলেন, ২০১৮ সালে সৌর সেচপাম্প চালুর আগে ডিজেলচালিত নলকূপে বিঘাপ্রতি সেচে প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হতো। বর্তমানে সৌর সেচপাম্পের মাধ্যমে বিঘাপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় সেচ দেওয়া যাচ্ছে, ফলে প্রায় ৫ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলায় ইডকলের সহযোগিতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়েভ ফাউন্ডেশন ৫৪টি সৌর সেচপাম্প স্থাপন করেছে। প্রতিটি পাম্পের আওতায় প্রায় ৬০ জন কৃষকের ১৮০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হয়। ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সমন্বয়কারী কিতাব আলী জানান, এসবের মধ্যে তিনটি প্রকল্প থেকে বছরে ২৫-৩০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। 

এডিবির রোডম্যাপ অনুযায়ী, বড় পরিসরে সৌর সেচপাম্প স্থাপন করা গেলে বছরে কয়েক লাখ টন ডিজেল সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। শুধু জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমবে না, একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।

তাইজুল ইসলামের কাছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন নিঃসরণ কিংবা জ্বালানি রূপান্তরের মতো শব্দগুলো খুব পরিচিত নয়। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, আগে যেখানে ডিজেলের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেখানে সূর্যের আলোই কাজ করছে।

পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশগুলোর একটি। অথচ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশের অবদান খুবই কম।

২০২৩ সালে করা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘রোড ম্যাপ টু স্কেল আপ সোলার ইরিগেশন পাম্পস ইন বাংলাদেশ (২০২৩-২০৩১)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেচপাম্পের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেল জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমাতে সক্ষম হবে। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হবে।

তবু কেন ধীরগতি

এডিবির প্রতিবেদনে সৌরশক্তিকে কৃষি খাতে ব্যবহারের ফলে সম্ভাব্য সুবিধার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার সৌর সেচপাম্প স্থাপন করা হবে। ফলে প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হবে। দেশের জাতীয় গ্রিডে বা জ্বালানি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হবে। বর্তমান ডিজেলের দাম বিবেচনায় বছরে প্রায় ৩৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে। বর্তমান মূল্যে ৪ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। 

কিন্তু কৃষিতে সৌরশক্তির ব্যবহারের অগ্রগতি এখনো সন্তোষজনক নয়। এর বড় কারণ অর্থায়ন, সৌর সেচপাম্প স্থাপনে ব্যয় বেশি এবং জমি সহজলভ্য নয়। 

এ ছাড়া অনেক সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। সেচের কাজ খুব বেশি হলে পাঁচ মাসের জন্য দরকার হয়। বাকিটা সময় এর ব্যবহার কী হবে বা উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের কী হবে, সেই ভাবনায় অনেকেই এর ব্যবহারে আগ্রহী হয় না। এ কারণে এখন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ জন্য নীতিগত সমন্বয়, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর মডেল প্রয়োজন বলে মনে করেন ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যদি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে এই পাম্পগুলোকে যুক্ত করে, তাহলে একটা সর্বনিম্ন খরচে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব। এটা করা জরুরি। 

এ ক্ষেত্রে কম সুদে সৌরচালিত সেচ বা অন্য উদ্যোগে ঋণ দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দীপাল বড়ুয়া বলেন, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের ১০ হাজারের বেশি শাখা আছে। প্রতিটি ব্যাংক ৫ জন করে গ্রাহককে ঋণ দিলেও এ খাতে বিপুল পরিমাণ সাশ্রয় হবে। 

নতুন দিনের আশা

বিকেলের দিকে ধীতপুরের সৌর প্যানেলগুলোর ওপর আলো একটু নরম হয়ে আসে। দূরে সুতিয়া নদী। নদীর পানি টেনে আনা হচ্ছে জমিতে। পাশে দাঁড়িয়ে কৃষকেরা সেচের হিসাব করছেন।

তাইজুল ইসলামের কাছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন নিঃসরণ কিংবা জ্বালানি রূপান্তরের মতো শব্দগুলো খুব পরিচিত নয়। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, আগে যেখানে ডিজেলের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেখানে সূর্যের আলোই কাজ করছে।

কৃষি এখনো বিপুলভাবে নির্ভরশীল ডিজেলের ওপর। বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি পুড়িয়ে মাঠে পানি পৌঁছানো হয়। সেই বাস্তবতা এক দিনে বদলাবে না।