
পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম এসেছে।
আজ মঙ্গলবার এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর মো. বোরহান উদ্দিন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান।
বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘২০২৪ সালের শেষের দিকে নভেম্বরে আমরা নিয়োগ পেয়েছি। আমাদের সময়কালে ৭০ জন সাক্ষীকে আমরা পরীক্ষা করেছি। সব মিলিয়ে ৩০১ বা ৩০২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। তাঁদের জবানবন্দি থেকে বেশ কিছু আসামির নাম উঠে এসেছে; যাঁরা বিস্ফোরকদ্রব্য ব্যবহার করেছেন, গুদাম থেকে বিস্ফোরকদ্রব্য লুট করেছেন। কোনো কোনো আসামির নিজস্ব লকার, ট্রাংক, সুটকেস থেকেও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য কর্তৃপক্ষের চাপ আছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা কাজ করছি।’
সাক্ষীদের জবানবন্দিতে নতুন নাম আসার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘হ্যাঁ, নতুন করে অনেকের নাম এসেছে। চার্জশিটের (অভিযোগপত্রের) বাইরে এদের নাম এসেছে। এই ব্যক্তিদের নাম ইতিপূর্বে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা বেগম (খাতুন), বেশ কিছু সংসদ সদস্যসহ তাদের নাম এসেছে। কিছু আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের নামও এসেছে। আইন আছে এগুলোকে (অভিযোগপত্রে) অন্তর্ভুক্ত করার।’
পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) সদর দপ্তরে নির্মম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুটি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্ট ইতিমধ্যে রায় দিয়েছেন। মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য এখন আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে করা মামলায় বিচারিক আদালতে এখনো সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এ মামলার সাক্ষী ১ হাজার ৩৪৪ জন।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবি) সদর দপ্তর ঢাকার পিলখানায় বিদ্রোহ হয়। সেদিন বিডিআরের কয়েক শ সদস্য পিলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালান। প্রায় দুই দিনব্যাপী চলা বিদ্রোহে বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। সব মিলিয়ে ৭৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পিলখানায় বিডিআরের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বপালনরত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও সেদিন নৃশংসতার শিকার হন।
পিলখানায় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে পৃথক মামলা হয়। হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয় ৮৫০ জনকে। দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটিই সবচেয়ে বড় মামলা। বিচারিক আদালত ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর এ মামলার রায় দেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে খালাস পান ২৭৮ জন। রায় ঘোষণার আগে চার আসামি মারা যান।
যেকোনো হত্যাকাণ্ডের মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হাইকোর্টে অনুমোদনের জন্য আসে। পিলখানা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। রায়ে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় ২২৮ জনকে। খালাস পান ২৮৩ জন। হাইকোর্টের রায়ের আগে ১৫ জনসহ সব মিলিয়ে ৫৪ আসামি মারা যান।