
ভুক্তভোগী ও বিচারপ্রার্থীদের ‘শেষ আশ্রয়স্থল’ হলো আদালত। তাই রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আদালতের বিশেষ সম্মান বা মর্যাদা রয়েছে। এ কারণে আদালত অবমাননা বিষয়টি যেমন আলোচিত, তেমনি গুরুত্বপূর্ণও বটে। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত আইনে (দ্য কনটেম্পট অব কোর্টস অ্যাক্ট, ১৯২৬) আদালত অবমাননার কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
এর ফলে আদালত অবমাননা কী, তা বুঝতে বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া আদেশ, নির্দেশ বা পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করতে হয়। সহজ করে বললে আদালত অবমাননা হতে পারে তিনভাবে। প্রথমত, আদালতের অভ্যন্তরে বিচারিক কার্যক্রম চলা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে আদালত বা বিচারককে উদ্দেশ করে ‘অবমাননাকর’ কিছু বলা বা আদালতের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করা।
দ্বিতীয়ত, আদালতের দেওয়া কোনো রায়, আদেশ বা নির্দেশ অমান্য করা এবং তৃতীয়ত, আদালতের বাইরে কোনো সভা–সমাবেশে অথবা সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদালত বা বিচারক বা বিচারকার্য নিয়ে ‘মর্যাদাহানিকর’ বক্তব্য দেওয়া।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হলো এর সংবিধান। সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টকে ‘কোর্ট অব রেকর্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে এই অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে সুপ্রিম কোর্টকে তাঁর অবমাননার জন্য তদন্তের আদেশদান বা দণ্ডাদেশের ক্ষমতাসহ আইন সাপেক্ষে অনুরূপ আদালতের সব ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্ট চাইলে যেকোনো আদালত অবমাননার ঘটনা আমলে নিতে এবং বিচার করতে পারবেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে আদালত অবমাননা আইন, ১৯২৬ প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ আইনটিতে দণ্ডের কথা উল্লেখ থাকলেও আদালত অবমাননার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এর ফলে এটা ছিল অনেকটা আদালতের ‘ইচ্ছাধীন’ বিষয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে আমাদের দেশের মতো ভারত ও পাকিস্তানেও একই আইন প্রচলিত ছিল।
তবে ভারতে ১৯৭১ সালে এবং পাকিস্তানে ১৯৭৪ সালে এ বিষয়ে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা হয়। আদালত অবমাননা বিষয়টিকে সুনির্দিষ্ট ও এর সীমারেখার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করতে প্রথমে ২০০৮ সালে আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ এবং পরে ২০১৩ সালে আদালত অবমাননা আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু হাইকোর্ট ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে আদালত অবমাননা আইনটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এর প্রায় ৯ বছরের বেশি সময় পর ২০২২ সালের নভেম্বরে আদালত অবমাননা নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আদালতের কোনো স্থাগিতাদেশ না থাকায় আদালত অবমাননা আইন, ১৯২৬ বহাল থেকে যায়।
১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ২২৮ ধারামতে, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের যেকোনো পর্যায়ে দায়িত্বপালনকালে কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে (দায়িত্বরত ব্যক্তিকে) ‘অপমান’ করেন বা কাজে বাধা দেন, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত যেকোনো পরিমাণ অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ফৌজদারি আইনের ৩৫ অধ্যায়ের বিধান অনুসারে, বিচারকার্য সমাপ্তির পূর্বে আদালতের সামনে ‘অবমাননা’ ঘটলে অনধিক ২০০ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ১ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দিতে পারেন।
তবে ক্ষেত্রবিশেষে আদালত অবমাননার অভিযোগে অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন। এ ছাড়া আদালত অবমাননা আইন, ১৯২৬ অনুসারে অবমাননাকারীকে অনধিক ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করে আদালত সাজা দিতে পারেন।
সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে আদালত নোটিশের মাধ্যমে কারণ দর্শাতে বলতে পারেন। এতে সন্তুষ্ট না হলে আদালত দণ্ডারোপ করতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের অপরাধে কেউ আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করলে আদালত তাঁকে সতর্ক করে ক্ষমা করারও এখতিয়ার রাখেন।
বাহাউদ্দিন আল ইমরান আইনজীবী