
অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বডি–ওর্ন ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছিল পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে। অপরাধ দমনে এ প্রযুক্তির প্রত্যাশিত ভূমিকা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে কেনা সেই ক্যামেরা এখন পুলিশের নিয়মিত পিটি-প্যারেডে ব্যবহারের নির্দেশনা এসেছে।
৩ জুন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, পুলিশ সদস্যদের শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা এবং অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পিটি-প্যারেড চলাকালে অনলাইন বডি–ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করে কার্যক্রম নজরদারি করা হবে। এর মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পিটি-প্যারেড সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক নির্দেশনাও দিতে পারবেন। জেলা ও মহানগর ইউনিটগুলোকে বিদ্যমান ক্যামেরা থেকে অন্তত একটি করে ক্যামেরা পিটি-প্যারেডে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্যামেরার নিরাপত্তা ও ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বনের কথা উল্লেখ করে নির্দেশনায় বলা হয়, অবহেলায় কোনো ক্যামেরা হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীকেই দায়ী করা হবে। ৭ জুনের মধ্যে ক্যামেরার আইডি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে।
তবে পুলিশের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বডি–ওর্ন ক্যামেরাগুলো যে উদ্দেশ্যে কেনা হয়েছিল, তা পূরণ না হওয়ায় এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহার কতটা যৌক্তিক?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে বলছেন, বডি–ওর্ন ক্যামেরা কেনা হয়েছিল মূলত অপরাধ দমন কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অভিযান ও ঘটনাস্থলের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে এর কার্যকর ব্যবহার না থাকায় মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হয়েছে।
অপরাধ দমনের মূল উদ্দেশ্যে কেনা বডি–ওর্ন ক্যামেরা ভিন্ন কাজে ব্যবহারে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মাঠপর্যায়ের একাধিক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক ইউনিটে ক্যামেরা থাকলেও নিয়মিত ব্যবহার বা সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত নির্দেশনা ও তদারকি নেই। কোথাও কোথাও ক্যামেরা চালু না রেখেই ডিউটি সম্পন্ন করার অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিটি কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, যথাযথ ফিজিবিলিটি স্টাডি, ব্যবহার নির্দেশিকা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এসব ক্যামেরা কেনা হয়েছে। ফলে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে এখন অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নীতিগতভাবে উদ্দেশ্য বিভ্রাটের উদাহরণ।
গত বছরের ১১ আগস্ট তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য প্রায় ৪০ হাজার বডি–ওর্ন ক্যামেরা সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, পুলিশের কাছে ১০ হাজার বডি–ওর্ন ক্যামেরা আছে। নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য আরও ৪০ হাজার বডি–ওর্ন ক্যামেরা কেনা হবে।
সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, বডি–ওর্ন ক্যামেরা কেনা হয়েছিল মূলত অপরাধ দমন কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অভিযান ও ঘটনাস্থলের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে এর কার্যকর ব্যবহার না থাকায় মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে ১৫ হাজার অনলাইন বডি–ওর্ন ক্যামেরা কেনা হয়েছিল। এসব ক্যামেরা এখন অপরাধ দমন এবং অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের কাছে এখন পর্যাপ্ত বডি–ওর্ন ক্যামেরা আছে। এগুলো বিভিন্ন অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন এই ক্যামেরা পিটি-প্যারেড নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হবে। এর মধ্য দিয়ে দুটি কাজ হবে। একটি হচ্ছে পিটি-প্যারেড নজরদারি, অন্যটি হচ্ছে এই ক্যামেরার ব্যবহার শেখানো। আর এখন পুলিশের কাছে পর্যাপ্ত বডি–ওর্ন ক্যামেরা থাকার কারণে অপারেশনাল কার্যক্রমে ব্যবহারেও কোনো ঘাটতি হবে না।
বডি–ওর্ন ক্যামেরা কী
বডি-ওর্ন ক্যামেরাকে ‘বডিক্যাম’ বা ‘বডি ক্যামেরা’ নামেও ডাকা হয়। অন্যান্য ক্যামেরার মতো এতে লেন্স, স্টোরেজ (ইন্টারনাল মেমোরি বা মাইক্রোএসডি), ব্যাটারি ও রেকর্ডিং কন্ট্রোল থাকে। তবে এই ক্যামেরার বিশেষত্ব হলো, এটি মানুষের শরীরে সংযুক্ত থাকে। আকারে ছোট। এই ক্যামেরা রাখার উদ্দেশ্য হলো, সামনের দৃশ্যের ভিডিও করা।
বডিক্যাম আলাদাভাবে চালানোর প্রয়োজন হয় না। সচল থাকলে তা লেন্সের আওতায় আসা সব দৃশ্য ভিডিও করে রাখে। ব্যবহারকারীর গতিবিধি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার গতিবিধিও বদলে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বডিক্যাম অডিও রেকর্ডও করে রাখে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যথাযথ ফিজিবিলিটি স্টাডি, ব্যবহার নির্দেশিকা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এসব ক্যামেরা কেনা হয়েছে। ফলে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে এখন অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নীতিগতভাবে উদ্দেশ্য বিভ্রাটের উদাহরণ।
২০১৪ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে বডি ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি তখন চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি মহানগর ও জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে সীমিত পরিসরে এর ব্যবহার চালু থাকলেও সার্বিকভাবে এটি কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র পর্যাপ্ত সংখ্যক বডি–ওর্ন ক্যামেরা থাকার কথা বলেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, পুলিশের কাছে এখন সব মিলিয়ে এই ক্যামেরা আছে ২৫ হাজার।
এ অবস্থায় অপরাধ দমনের মূল উদ্দেশ্যে কেনা বডি–ওর্ন ক্যামেরা ভিন্ন কাজে ব্যবহারে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।