জন্ম ও মৃত্যুসনদের তথ্যের সংশোধন চেয়ে ২৪ লাখ ৯১ হাজার ৫৪৬ আবেদন জমা পড়েছে।

তাসনিম ইবনে ফয়েজের (৩৪) জন্মনিবন্ধনে তাঁর ও মায়ের নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান, বাবার বাংলা বানানসহ মোট সাতটি ভুল। ভুলগুলো সংশোধনের জন্য তাঁর আবেদনপত্র নিয়ে ৪ অক্টোবর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫–এর কার্যালয়ে এসেছিলেন ছোট ভাই রায়হান ইবনে ফয়েজ। সাত-আট দিনের মধ্যে সংশোধন হবে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে।
৩ অক্টোবর সচিবালয়সংলগ্ন জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের এ কক্ষে-সে কক্ষে ঢুঁ মারছিলেন মো. শওকত। এ সময় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সৌদিপ্রবাসী তাঁর এক আত্মীয়ের জন্মসনদ সংশোধন করতে হবে। বিষয়টি তিনি জানতে এসেছেন।
জন্মসনদে সংশোধন ও ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রতিদিন স্থানীয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে মানুষ আসছেন। সারা দেশের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয় এবং দূতাবাসের মাধ্যমে (প্রবাসীরা) ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জন্ম ও মৃত্যুসনদের তথ্যের সংশোধন চেয়ে ২৪ লাখ ৯১ হাজার ৫৪৬টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে জন্ম তথ্য সংশোধনের আবেদনই ২৪ লাখ ৮৭ হাজারের বেশি।
হাতে লেখা জন্মসনদের অনেকগুলো অনলাইনে তোলা হয়েছে। জন্মনিবন্ধন নিয়েছিলেন এমন অনেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের নামও জন্মনিবন্ধনের মোট হিসাবের সঙ্গে গণনা করা হয়। এ ছাড়া কারও কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন রয়েছে।মির্জা তারিক হিকমত, জনসংখ্যার চেয়ে জন্মনিবন্ধন প্রায় সাড়ে চার কোটি বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে উপরেজিস্ট্রার জেনারেল
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ‘নির্ভুল জন্ম, মৃত্যুনিবন্ধন করব, শুদ্ধ তথ্যভান্ডার গড়ব’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার (৬ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস।
মো. শওকতের সৌদিপ্রবাসী আত্মীয়ের বাংলা নাম ও মায়ের নাম অসম্পূর্ণ। তাঁর পুরো নাম ‘রাজু উদ্দিন’ হলেও বাংলা নামে শুধু ‘রাজু’ এবং মায়ের নাম ‘রেনুয়ারা বেগম’–এর জায়গায় শুধু ‘রেনুয়ারা’ লেখা। তিনি রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ২০১৫ সালে জন্মনিবন্ধন করেছিলেন।
বাংলা নামের বানানে একটু বেশি ভুল হয় বলে স্বীকার করেন নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেন, বার্থ রেজিস্ট্রেশন ইনফরমেশন সিস্টেম (বিআরআইএস) সফটওয়্যারের মাধ্যমে ২০১০ সালের অক্টোবর থেকে অনলাইনে আবেদন শুরু হয়। ওই সময় একই সঙ্গে আগের হাতে লেখা আবেদনগুলো অনলাইনে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছিল। দক্ষ জনবলের অভাবে ইউপিতে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়েছে। অনেক ইউপি ও পৌরসভা অনলাইনভুক্ত করতে পুরোনো জন্মনিবন্ধনপ্রতি দুই টাকা করে আউটসোর্সিং করেছিল।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিবন্ধকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ভুল করেন, যাতে মানুষ সংশোধনের জন্য তাঁদের কাছে আসেন। এতে অনৈতিকভাবে তাঁদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। আবার অনেকে দোকান থেকে আবেদন করেন। এ সময় আবেদন জমা দেওয়ার আগে তথ্য ভালোভাবে পড়ে না দিলে ভুলের আশঙ্কা থাকে। এর বাইরে যান্ত্রিক কিছু ত্রুটিতেও ভুল হয়।
এমনও নজির রয়েছে, তিন-চার ব্যক্তির জন্মসনদে ১৭ ডিজিটের একই নম্বর দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তিকে ডেকে অগ্রাধিকার ঠিক করে একজনের সনদ রেখে বাকিদের বাতিল করা হয়। এই ভুল সংশোধনে ভোগান্তি অনেক।
গত বছর দক্ষিণ রায়েরবাগের বাসিন্দা সাকায়েতউল্লাহর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেছিলেন, তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের জন্মসনদের নম্বর এবং আরও দুজনের নম্বর একই। এ নিয়ে তিনি ছয় মাস ধরে ছোটাছুটি করছিলেন। পরে সমাধান হয়েছিল কি না, জানা যায়নি।
রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. রাশেদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ভুল শনাক্ত করে সমাধান করা হচ্ছে। আগের চেয়ে এখন ভুলের হার কম। ইউপি কার্যালয়গুলোতে দক্ষ জনবল দিয়ে নিবন্ধন ফরম পূরণের কথা বলা হয়েছে। অনিয়ম–দুর্নীতি রোধে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে।
জন্মনিবন্ধন সনদ ডিজিটাইজড হলেও একাধিক জন্মনিবন্ধন করার সুযোগ থেকেই যাচ্ছে। নাম, জন্মতারিখসহ ব্যক্তিগত তথ্য একটু এদিক-সেদিক করে অনেকে প্রয়োজনমতো একাধিক জন্মনিবন্ধন সনদ নিচ্ছেন। কেউ কেউ সন্তানকে কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তির চেষ্টায় একেকবার একেক জন্মসনদ নিচ্ছেন। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের মতে, এ সংখ্যা ৮–১০ লাখ।
২০০৬ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জন্মনিবন্ধন হয়েছে প্রায় ২১ কোটি ১১ লাখ। মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে ২৫ লাখের বেশি। সর্বশেষ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ অনুসারে, দেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন।
জনসংখ্যার চেয়ে জন্মনিবন্ধন প্রায় সাড়ে চার কোটি বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে উপরেজিস্ট্রার জেনারেল মির্জা তারিক হিকমত প্রথম আলোকে বলেন, হাতে লেখা জন্মসনদের অনেকগুলো অনলাইনে তোলা হয়েছে। জন্মনিবন্ধন নিয়েছিলেন এমন অনেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের নামও জন্মনিবন্ধনের মোট হিসাবের সঙ্গে গণনা করা হয়। এ ছাড়া কারও কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন রয়েছে।