জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে চলছে দেশের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। বুধবার বিকেলের চিত্র
জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে চলছে দেশের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। বুধবার বিকেলের চিত্র

জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনী

নভেরার শিল্পভুবনে সম্পর্কের গল্প

  • প্রদর্শনীতে মূল শিল্পকর্ম ছাড়াও আলোকচিত্র আছে ৪৩টি। রয়েছে নভেরা আহমেদের ব্যবহার করা কিছু পোশাক ও সামগ্রী।

  • প্রদর্শনী চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। সবার জন্য খোলা থাকবে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত।

মা দুই সন্তানকে নিয়ে যেন অভ্যর্থনা করার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। এটি একটি ভাস্কর্য। অনেকেই মুগ্ধ হচ্ছিলেন সেটি দেখে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ক্বাবেদুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে। বুধবার জাতীয় জাদুঘরে এসে ভাস্কর্যটি নজর কাড়ে তাঁদের।

মা ও সন্তানের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলা ভাস্কর্যটি রাখা জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষের প্রবেশপথের ঠিক সামনে। এই কক্ষে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে দেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের কালজয়ী শিল্পকর্মগুলো। শিল্পকর্মগুলো নিয়ে প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ৪ জুলাই।

ক্বাবেদুল ইসলাম পেশায় ব্যবসায়ী। মেয়ে তানহা ইসলাম অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ভাস্কর্য বা চিত্রকলার নিয়মিত দর্শক তাঁরা নন। জাদুঘরে ঘুরতে এসে এই প্রদর্শনী দেখা তাঁদের বাড়তি প্রাপ্তি। ক্বাবেদুল বললেন, নভেরার জীবনী সম্পর্কে এখানে বিস্তারিত লেখা আছে। তাঁর শিল্পকর্মগুলো তাঁদের অনেক ভালো লেগেছে।

নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যের একটি প্রধান বিষয় ছিল পরিবার। বিদগ্ধজনেরা সে সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি দেশে প্রাপ্য উপাদান ব্যবহার করেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাপের এসব পারিবারিক সম্পর্কের ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছিলেন। সেখানে আছে মায়ের সঙ্গে সন্তান—কোনোটিতে সন্তানের হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে মা, কোনোটিতে সন্তান কোলে মা।

দেশের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী দেখছেন প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতিবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। বুধবার বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে

বাবা-মা-সন্তান একসঙ্গে, পাশাপাশি দাঁড়ানো দম্পতি—এমন বেশ কিছু ভাস্কর্য আছে প্রদর্শনীতে। এসব ভাস্কর্যের কোনোটিতে আছে দুটি অবয়ব, কোনোটিতে তিন বা চারটি। নভেরা আহমেদ এসব অবয়ব বিভিন্ন কায়দায় সাজিয়েছেন। চিরন্তন অপত্যস্নেহ, প্রীতি, মমতা ও দায়িত্ববোধের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা নিবিড় পারিবারিক বন্ধন উপস্থাপন করেছেন নান্দনিক সুষমায়। সাধারণ ভাস্কর্যের মতো নাক-মুখ-চোখের গড়ন নভেরার এসব ভাস্কর্যে না থাকলেও দর্শকদের নিজের সহজাত উপলব্ধি দিয়ে পারিবারিক সম্পর্কের চিরন্তন মাধুর্য অনুভব করতে অসুবিধা হচ্ছে না।

প্রদর্শনীতে আরও আছে গরু নিয়ে কৃষক, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা নারী, তথাগত গৌতম বুদ্ধের ধ্যানস্থ মস্তক, শামুক—এমন আলাদা ধরনের বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য। সব মিলিয়ে ২৯টি ভাস্কর্য রয়েছে। বেশির ভাগই করা হয়েছে সিমেন্ট-বালু ব্যবহার করে। ব্রোঞ্জের ছোট আকারের কাজ আছে কিছু। ভাস্কর্য তৈরিতে নভেরা আহমেদ প্রধানত সহজলভ্য স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন। তিনি সিমেন্টের কোনো কোনো ভাস্কর্যের সঙ্গে গোলাপি বা সাদা রং প্রয়োগ করেছেন, কোনটি কালো। কোনোটিতে আবার ধূসর সিমেন্টের মূল রং অপরিবর্তিত রেখেছেন।

রিলিফ–চিত্রকর্মেও পারিবারিক সম্পর্ক

ভাস্কর্য ছাড়া অন্য শিল্পকর্মের মধ্য আছে তিনটি রিলিফ। এই রিলিফগুলোতেও তিনি পারিবারিক সম্পর্কের আবহ ফুটিয়ে তুলেছেন। আরও আছে মূল চিত্রকর্ম। এগুলোর বিভিন্ন মাধ্যমে করা। এতেও প্রাধান্য পেয়েছে পারিবারিক বন্ধনের বিষয়গুলো। সম্ভবত কোনো ভাস্কর্য করার আগে তাঁর ভাবনায় যে রূপটি ধরা দিয়েছে, সেগুলোই তিনি তুলে এনেছেন এসব চিত্রকর্মে। এ ছাড়া আছে কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকতের দৃশ্য, চন্দ্রালোকিত আকাশ, শকুন, টিয়া পাখি, ছাগল ইত্যাদি। চিত্রকর্মগুলোতে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করেছেন শিল্পী। প্রদর্শনীতে চিত্রকর্ম আছে ১১টি।

মূল শিল্পকর্ম ছাড়াও আলোকচিত্র আছে ৪৩টি। প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে করা নভেরার অনেক শিল্পকর্মের ছবি, নভেরা কাজ করার সময়ের ছবি। রয়েছে তাঁর পারিবারিক জীবনের কিছু দৃশ্য; আর মেঝের ওপরে রাখা একটি প্রদর্শন টেবিলে রয়েছে নভেরা আহমেদের ব্যবহার করা কিছু পোশাক ও সামগ্রী।

দেয়ালজুড়ে নভেরার জীবন

প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মের পাশাপাশি এক পাশের দেয়ালজুড়ে বিশালকায় বোর্ডে তুলে ধরা হয়েছে দেশের এই বরেণ্য ভাস্করের জীবনের কালক্রমিক ঘটনাপঞ্জি। এখানে দর্শকেরা সময়ের ধারাবাহিকতায় নভেরার জীবনের উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলো পাবেন। আরেকটি দেয়ালে একই রকম বড় আকারের বোর্ডে আছে নভেরাকে নিয়ে লেখক ও গবেষক শিকোয়া নাজনীনের একটি লেখা। এতে তিনি নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য ও আধুনিক ভাস্কর্য কলায় তাঁর অবদান তুলে ধরেছেন। লেখা ও জীবনপঞ্জিতে চোখ বুলিয়ে দর্শক যখন নভেরা সৃজনকর্মগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ান, তখন তাঁদের পক্ষে এই শিল্পের সৌন্দর্য–মর্মার্থ উপলব্ধি করার আনন্দ অনেক বেড়ে যায়।

নভেরা আহমেদের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চ। তিনি লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস থেকে ভাস্কর্য ও নকশা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পঞ্চাশের দশকে তাঁর হাত দিয়েই বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্যের সূচনা হয়। তিনি ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত শতাধিক ভাস্কর্য সৃষ্টি করেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশার কাজেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। সত্তরের দশকে নভেরা স্থায়ীভাবে ফ্রান্সে বসবাস শুরু করেন। প্যারিসে ২০১৫ সালে এই বরেণ্য ভাস্করের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এমন আরও বিস্তারিত তথ্য রয়েছে প্রদর্শনীতে।

জাতীয় জাদুঘর আয়োজিত এই প্রদর্শনীর কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি। জাদুঘরের নিজস্ব সংগ্রহে থাকা নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মগুলোই উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রদর্শনী চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে।

‘নভেরা কোনো ছকবাঁধা নিয়মে কাজ করেননি’

জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনকক্ষে চলছে দেশের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। বুধবার বিকেলে প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা করেন লেখক ও গবেষক শিকোয়া নাজনীন। সঙ্গে ছিলেন অতিথি ও দর্শকেরা

বিকেলে ছিল প্রদর্শনী উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন ‘‌গ্যালারি ওয়াক: শিকোয়া নাজনীনের সাথে’ (নভেরাকে নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘নভেরা: শিল্পের রহস্য মানবী’, প্রথমা প্রকাশন, ২০২১)। শিকোয়া নাজনীন বলেন, ‘নভেরা কোনো ছকবাঁধা নিয়মে কাজ করেননি। তিনি অনেক বড় এক জীবনের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাজের মধ্য একধরনের নির্জনতা রয়েছে, রয়েছে আধ্যাত্মিকতা। এই ভাস্কর্যগুলোর সামনে দিয়ে গেলে মনে হবে যেন তারাও দর্শকদের দেখতে পাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা বিস্ময়কর।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতিবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম আবদুল্লাহ ও জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম। সভাপতিত্ব করেন জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। স্বাগত বক্তব্য দেন জাদুঘরের সচিব সাদেকুল ইসলাম।

নভেরা আহমেদের এত শিল্পকর্ম একসঙ্গে দেখার সুযোগ সচরাচর মেলে না। এবারের এই প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র, ব্যক্তিগত স্মারক ও জীবনপঞ্জি—সব মিলিয়ে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে দেশের ভাস্কর্যের পথিকৃতের সৃজন জীবনের বিস্তারিত চিত্র। ফলে দর্শকেরা প্রদর্শনীতে এলে যেমন নভেরা অনবদ্য সৃজনকর্ম উপভোগের আনন্দ পাবেন, তেমনি তাঁকে নতুন করে আবিষ্কারের জন্য এই প্রদর্শনী হয়ে উঠতে পারে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।