গ্রামের বাড়িতে দাদা–দাদি, মা–বাবা ও ছোট বোনের সঙ্গে সাইদুল
গ্রামের বাড়িতে দাদা–দাদি, মা–বাবা ও ছোট বোনের সঙ্গে সাইদুল

প্রথম আলোর ফেসবুক পোস্ট

পাঁচ বছর ঢাকার রাস্তায় থাকার পর ঘরে ফেরা শিশুটি পেল নতুন জীবন

ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় পাঁচ বছর পথশিশু হয়ে কাটানোর পর ঘরে ফিরে গেছে সাইদুল (১২)। ফেরার পর নিজের বাড়িতে মা, বাবা, ভাই, বোন, দাদা ও দাদির সঙ্গে প্রথম দিনটি কেটেছে তার। সে ফুটবল খেলেছে। ভালো খাবার খেয়েছে। দেখা করেছে তাকে দেখতে আসা আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে।

সাইদুল গতকাল বুধবার রাত আটটার দিকে মুঠোফোনে বলেছে, ‘আইজগা খেলাধুলা করলাম। ভাত–পানি খাইছি। তারপর আমার আব্বুর মোবাইল আছে না, ওইহানে কার্টুন দেখছি। আমার ছোট ভাই মিরাজ আছে না, ওর লগে খেলছি। ফুটবল খেলছি।’

সাইদুলের বাবার কাছ থেকে মুঠোফোন নিয়ে সাইদুলের দাদি পেয়ার বানু কথা বলেন আমার সঙ্গে। শুরুতেই তিনি অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘তোমগোর উছিলায় যে নাতিরে পাইছি। কলিজাটা ঠান্ডা হইছে বাবা।’

২০২১ সালে চট্টগ্রাম থেকে হারিয়ে যায় সাইদুল। তখন তাঁর বয়স ছিল সাত। সে ট্রেনে ঢাকায় চলে এসেছিল। পথশিশুদের নিয়ে প্রতিবেদনের কাজ করতে গিয়ে ১০ এপ্রিল সাইদুলের সঙ্গে আমার দেখা হয় রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায়। সে তখন বাড়ি ফেরার আকুতি জানিয়েছিল। আমি বিষয়টি অফিসে জ্যেষ্ঠ কর্মীদের জানাই। তাকে নিয়ে গত সোমবার প্রথম আলো নিজেদের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেয়। সেই পোস্টের নিচে সাইদুলের একজন স্বজন লেখেন, তিনি ওকে চেনেন। পরে তিনি সাইদুলের পরিবারের মুঠোফোন নম্বর দেন। তার মাধ্যমে যোগাযোগ করে সাইদুলের মা–বাবাকে ঢাকায় আসতে বলা হয়।

সাইদুলের মা–বাবা গত মঙ্গলবার ঢাকায় আসেন। তাঁদের নিয়ে পল্টন এলাকায় গিয়ে খুঁজে বের করা হয় সাইদুলকে। পল্টন থানায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে হস্তান্তর করা হয় পরিবারের কাছে।

পাঁচ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সন্তান সাইদুলকে খুঁজে পেয়ে কাঁদছিলেন মা-বাবা। পাশে ছোট ভাই মিনহাজ। গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায়
নিজের অটোরিকশা নিয়ে তাকে নিতে এসেছিলেন সাইদুলের চাচা মো. পারভেজ। সাইদুলকে দেখেই জড়িয়ে ধরেন তিনি। এরপর সাইদুলের বাড়ির পথে জায়গায় জায়গায় আটকে সাইদুলের সঙ্গে এলাকার মানুষ দেখা করেন। তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করে সাইদুল।

সাইদুল তখন বলেছিল, ঢাকায় এসে ক্ষুধার জ্বালায় সে পুরোনো লোহালক্কড়, তথা ভাঙারির দোকানে কাজ শুরু করে। বোতল টোকানোর কাজ করেছে। মানুষের সাহায্য চেয়েও চলেছে। থাকত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে (বিজয়নগর এলাকা) একটি বটগাছের নিচে। পথশিশুদের একটি দলই তার পরিবার হয়ে উঠেছিল।

পথে পথে ঘুরে বোতল কুড়ানোর কাজ করত সাইদুল। ১০ এপ্রিল রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকার ছবি

সাইদুলের বাবা মো. মোস্তফা কামাল ও মা ফাতেমা আক্তার সেদিনই সাইদুলকে নিয়ে নিজেদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনায় যান। সাইদুল কেমন আছে, কী করছে—তা জানতে গতকাল একাধিকবার মুঠোফোনে কথা হয় তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। তাঁরা জানান, মঙ্গলবার রাত পৌনে আটটায় কুমিল্লা পৌঁছায় সাইদুল। নিজের অটোরিকশা নিয়ে তাকে নিতে এসেছিলেন সাইদুলের চাচা মো. পারভেজ। সাইদুলকে দেখেই জড়িয়ে ধরেন তিনি। এরপর সাইদুলের বাড়ির পথে জায়গায় জায়গায় আটকে সাইদুলের সঙ্গে এলাকার মানুষ দেখা করেন। তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করে সাইদুল।

সাইদুলের বাবা বলেন, ‘ওরে দেখতে পায়া সবাই খুশি। এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার যারা আছে, সবাই আইছে। তারপর আমার আব্বা–আম্মু অসুস্থ হয়ে গেছিল ওরে হারায়া। তাদের এখন ভালো লাগতাছে। আমি এখন আল্লাহর কাছে অনেক খুশি।’

সাইদুলের বাবার কাছ থেকে মুঠোফোন নিয়ে সাইদুলের দাদি পেয়ার বানু কথা বলেন আমার সঙ্গে। শুরুতেই তিনি অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘তোমগোর উছিলায় যে নাতিরে পাইছি। কলিজাটা ঠান্ডা হইছে বাবা।’

গত মঙ্গলবার মা-বাবার সঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে সাইদুল। পাঁচ বছর পর গ্রামে ফিরছিল ছেলেটি। তখন হাত নেড়ে বিদায় জানায় সে। পল্টন মডেল থানার সামনে

ঢাকা থেকেই সাইদুলের জন্য পোশাক কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন তার মা–বাবা। তাঁরা জানান, জুতা কিনতে পারেননি। কুমিল্লায় পৌঁছে তাঁরা সাইদুলের জন্য জুতা কেনেন।
সাইদুলের মা ফাতেমা বলেন, ‘বাড়িতে আইনা দুধ পিয়াইছি। গোসল দেওয়ার পর লোশন দিছি, চুল আছড়াই দিছি। তারপরে ওরে ভাত দিছি।’

আজ বৃহস্পতিবার সাইদুলকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা রয়েছে তার বাবা–মায়ের। বাবা সেখানে অটোরিকশার মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। মা কাজ করেন পোশাক কারখানায়। সেখানে নিয়ে সাইদুলকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন তাঁরা।

সাইদুলের মা–বাবা বলেছেন, তাঁরা আপাতত সাইদুলকে গ্রামের বাড়িতেই রাখতে চান। তার দাদা–দাদির চাওয়া, সে তাঁদের সঙ্গে কুমিল্লাতেই থাকুক। সাইদুলও দাদা–দাদির সঙ্গে থাকতে চায়। পরে তাকে আবার পড়াশোনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হবে।

মোস্তফা কামাল ও ফাতেমা দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় সাইদুল। হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে খুঁজে পেয়ে কেমন লাগছে, জানতে চেয়েছিলাম ফাতেমার কাছে।

তিনি বলেন, ‘ওরে সারাক্ষণ চোখের সামনে পাইয়া কেমন যে লাগতেছে, ওইটা বুঝান যাইত না। আপনে পোলা মানুষ, বুঝবেন না। একটা মা যখন নতুন মা হইতে যায়, তখন তার যেমন একটা খুশি, ও রকম খুশি লাগতাছে।’