
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ অর্থাৎ এসএমই খাত দীর্ঘদিন ধরেই প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি। শহর থেকে গ্রাম, পরিবারভিত্তিক ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ—এসবই এসএমই খাতকে করে তুলেছে বৈচিত্র্যময় এবং একই সঙ্গে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এ খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যবসা শুরু করা বা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অনেক উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় উপযুক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা। এই প্রেক্ষাপটে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের এসএমই ইনভেস্টমেন্ট নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।
ইসলামি ব্যাংকিং-ব্যবস্থায় অর্থায়নের মূল ভিত্তি হলো সুদমুক্ত লেনদেন এবং বাস্তব সম্পদ বা ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ। মুরাবাহা, মুশারাকা, এইচপিএসএম বা ইজারা—এ ধরনের বিভিন্ন শরিয়াহসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়নের সুযোগ পেয়ে থাকেন। এতে ব্যাংক ও উদ্যোক্তার মধ্যে একটি অংশীদারত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়, যেখানে লাভ-ক্ষতির বিষয়টিও স্বচ্ছ কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। ফলে ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি আরও সুসংগঠিতভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে এ সময়ে তরুণদের মধ্যে ব্যবসা শুরু করার আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু মূলধনের অভাব অনেক সময় এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ নিতে বাধা দেয়। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের এসএমই ইনভেস্টমেন্ট এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। ব্যবসার প্রকৃতি, বাজার সম্ভাবনা এবং উদ্যোক্তার পরিকল্পনা বিবেচনা করে বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়ার ফলে নতুন উদ্যোক্তারা তাঁদের উদ্যোগকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে পারছেন।
এসএমই খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনা। শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও ছোট ব্যবসা ও উদ্যোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা হস্তশিল্প—এসব ক্ষেত্রেও শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়ন নতুন সুযোগ তৈরি করছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্যোক্তারা অর্থনীতির মূলধারার সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারছেন।
এসএমই খাতেই দেশের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় অংশ তৈরি হয়। একটি ছোট ব্যবসা বড় হলে সেখানে নতুন কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়, স্থানীয় অর্থনীতি সক্রিয় হয় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে। শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে এ খাতে অর্থায়ন বাড়লে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তবে ব্যবসা পরিচালনায় ঝুঁকি একটি স্বাভাবিক বিষয়। এ জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও আর্থিক কাঠামো। কারণ, সঠিক পরিকল্পনা ও আর্থিক কাঠামো থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ইসলামি ব্যাংকিং–ব্যবস্থায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসার প্রকৃতি, বাজার বিশ্লেষণ এবং উদ্যোক্তার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় পরামর্শ ও সহায়ক সেবাও দেওয়া হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসাকে আরও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করে।
একটি ব্যবসা শুরু করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেটিকে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসএমই ইনভেস্টমেন্ট উদ্যোক্তাদের সেই পথচলাকে সহজ করতে পারে। উৎপাদন বাড়ানো, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা নতুন পণ্য চালুর মতো উদ্যোগে এ ধরনের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যে শরিয়াহভিত্তিক এসএমই অর্থায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে কিছু ব্যাংক গ্রাহকবান্ধব সেবা ও বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পণ্যের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রাইম ব্যাংকও এসএমই খাতে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ সুবিধা চালু করেছে। ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী নমনীয় কাঠামো এবং উদ্যোক্তাদের সহায়তামূলক সেবার মাধ্যমে ব্যাংকটি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এম নাজিম এ চৌধুরী বলেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এসএমই খাতের জন্য শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে হলে ব্যাংকগুলোকে কয়েকটি নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা যেমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ সহজলভ্য করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, খাতভিত্তিক বিশেষায়িত পণ্য যেমন কৃষি, হস্তশিল্প বা পরিবহন খাতের জন্য আলাদা শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ স্কিম চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচি বাড়ানো দরকার, যাতে তাঁরা শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের নিয়ম ও সুবিধা ভালোভাবে বুঝতে পারেন।’
এম নাজিম এ চৌধুরী আরও বলেন, ‘ইসলামি এসএমই বিনিয়োগ কার্যকর করতে নতুন উদ্যোক্তা, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে ইসলামি এসএমই ইনভেস্টমেন্ট সহজলভ্য করতে হলে সহায়ক সেবার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সহজ ডকুমেন্টেশন ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ে শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য মেন্টরশিপ বা ব্যবসায়িক পরামর্শ প্রদান। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি চালু করলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইসলামি এসএমই বিনিয়োগ আরও কার্যকর হবে।’