
যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার আওতায় গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন তদারকির দায়িত্বে থাকা ‘ফিলিস্তিনি কমিটি’ তাদের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে তারা নিজেদের প্রধান অগ্রাধিকার ও লক্ষ্যগুলো তুলে ধরেছে।
গাজা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির (ন্যাশনাল কমিটি ফর গাজা ম্যানেজমেন্ট–এনজিএসি) জেনারেল কমিশনার আলী শাথ বলেছেন, তাঁরা গাজায় মৌলিক সেবাগুলো পুনরায় চালু করতে চান এবং সেখানে এমন একটি সমাজ গঠনে কাজ করতে চান, যার মূল ভিত্তি হবে শান্তি।
বিবৃতিতে আলী শাথ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন শান্তি পর্ষদের (বোর্ড অব পিস) নির্দেশনা এবং গাজা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধির সমর্থন ও সহায়তায় আমাদের লক্ষ্য হলো গাজা উপত্যকাকে পুনর্গঠন করা। এই পুনর্গঠন কেবল অবকাঠামোগত নয়, বরং এর আত্মিক পুনর্গঠনও বটে।’
গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এনজিএসি গঠিত হয়েছে। এটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবের আওতায়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এই কমিটি উপত্যকাটির দৈনন্দিন পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করবে। একই সঙ্গে সেখানে ‘দীর্ঘমেয়াদি ও স্বনির্ভর শাসনের ভিত্তি স্থাপন করবে’।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠন কার্যক্রম সার্বিকভাবে তদারকি করবে ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ। আর এটি নিবিড়ভাবে পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ বা গাজা নির্বাহী পর্ষদ।
এনজিএসিকে বিরাট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের হামলায় গাজা আজ পুরোপুরি বিধ্বস্ত। তা ছাড়া এই প্রশাসন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে।
শান্তি পর্ষদ ও গাজা নির্বাহী পর্ষদে ইসরায়েলের কট্টর সমর্থকদের উপস্থিতি এবং ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতির ঘাটতিতে ওই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সাবেক উপমন্ত্রী আলী শাথ বিবৃতিতে বলেছেন, তাঁদের প্রধান কাজ হবে (গাজা) উপত্যকায় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া মৌলিক সেবাগুলো পুনরায় চালু করা। বর্তমানে গাজা উপত্যকার অর্ধেকের বেশি এলাকা সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আলী শাথ বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবাগুলো, যা মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি, সেসব পুনরায় চালু করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই সঙ্গে আমরা শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে একটি সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করব।’ তিনি বলেন, ‘সর্বোচ্চ মানের সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করে এনসিএজি একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলবে, যা বেকারত্ব দূর করে সবার জন্য সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হবে।’
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির তোয়াক্কা না করে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলো বলছে, ফিলিস্তিনিদের কাছে (মানবিক) সেবাগুলো পৌঁছে দেওয়াটা জরুরি।
এই সময়ে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় আরও কয়েক শ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে উপত্যকাটিতে নিহতের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৫৪৮ জনে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় পর্যায়ের অংশ হিসেবে শান্তি পর্ষদ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে বিদেশি নেতাদের এই পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে ট্রাম্পের পাঠানো চিঠিগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সম্ভবত একে জাতিসংঘের মতো প্রচলিত আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোকে পাশ কাটানোর একটি মডেল হিসেবে দেখছেন।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল জানায়, তারা গাজায় তিন ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করছে।
কিছু ফিলিস্তিনি এমন আশঙ্কাও করছেন যে এনজিএসির এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কিংবা কয়েক দশকের ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসানের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে এড়িয়ে যেতে পারে। এর বদলে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির দিকেই বেশি নজর দেওয়া হতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।
বিবৃতিতে আলী শাথ বলেন, ‘এই কমিটি শান্তিকে আলিঙ্গন করবে। এর মাধ্যমে আমরা ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নিশ্চিতের পথ প্রশস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করব।’