
ছেলে বা মেয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফল করে নতুন শ্রেণিতে উঠেছে—এ আনন্দের মধ্যেই অনেক অভিভাবকের মনে ঢুকে পড়ে একধরনের আতঙ্ক। কারণ, একই প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে ‘পুনর্ভর্তি ফি’র নামে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। চলতি বছরও এমন অর্থ পরিশোধ করেছেন অসংখ্য অভিভাবক।
প্রতিবছর পুনর্ভর্তি ফি নামের আর্থিক চাপ থেকে মুক্তি চান অভিভাবকেরা। বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিট আবেদনও হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৯ ফেব্রুয়ারি ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনোভাবেই পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। তবে ২০২৪ সালের টিউশন ফি নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন নেওয়া যাবে।
নীতিমালায় টিউশন ফি, ভর্তি ফি, সেশন ফি, বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার ফিসহ যাবতীয় আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সই করা এ নির্দেশনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৯ ফেব্রুয়ারি ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনোভাবেই পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। তবে ২০২৪ সালের টিউশন ফি নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন নেওয়া যাবে।
এর আগেও সরকারের পক্ষ থেকে একই ধরনের নির্দেশনা জারি হয়েছিল। গত বছরের ১৯ নভেম্বর সচিব রেহানা পারভীনের সই করা বেসরকারি স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ (মাধ্যমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও সংযুক্ত প্রাথমিক স্তর) শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালাতেও বলা হয়েছিল, একই প্রতিষ্ঠানে এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে পুনর্ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না; কেবল সেশন চার্জ নেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে বহু প্রতিষ্ঠান তা মানেনি।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার। একাদশ-দ্বাদশ পর্যায়ে আছে আরও প্রায় ২২ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৮ শিক্ষার্থী। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের ওপর এই ফি বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
ফেব্রুয়ারির বেতনের সঙ্গে জেনারেটর ও আইপিএস ফি হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। সব শাখা মিলিয়ে এ বছর ভর্তি হওয়া প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে এ খাতে আদায় হতে পারে এক কোটির বেশি টাকা। অথচ জেনারেটরের সংখ্যা, ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কোনো হিসাব প্রকাশ করা হয় না বলে অভিযোগ তাঁর।টিপু সুলতান, অভিভাবক
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তাঁদের কেউ সন্তানকে ভর্তির জন্য পুনর্ভর্তি ফি দিয়েছেন। আবার সরাসরি পুনর্ভর্তি ফি না নিয়ে ‘উন্নয়ন ফি’, ‘রিলেশন ফি’, ‘স্কাউট ফি’ বা বাড়তি সেশন ফি হিসেবে অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা। তবে সন্তানের পড়ালেখায় ক্ষতি হতে পারে ভেবে অনেকেই স্কুলের নাম বললেও নিজের নাম–পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
রাজধানীর নামী একটি স্কুলের টিপু সুলতান নামের একজন অভিভাবক ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ফেব্রুয়ারির বেতনের সঙ্গে জেনারেটর ও আইপিএস ফি হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। সব শাখা মিলিয়ে এ বছর ভর্তি হওয়া প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে এ খাতে আদায় হতে পারে এক কোটির বেশি টাকা। অথচ জেনারেটরের সংখ্যা, ব্যবহার বা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কোনো হিসাব প্রকাশ করা হয় না।
অন্য আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন অভিভাবক বলেন, একই স্কুলে পাশের কক্ষেই নতুন শ্রেণির পাঠদান হবে, তবু হাজার হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। সরকার নিষেধ করলেও প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে না। আবার সরকারের যেসব প্রতিনিধিদের বিষয়টি দেখভালের কথা, তাঁরাও থাকেন নিশ্চুপ।
আলী আসগর আকন পেশায় সাংবাদিক। তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে চাকরি করেন। তিনি বলেন, তাঁর মেয়ে বরিশালের একটি স্কুলে পড়ে। মেয়েকে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি বাবদ পুনর্ভর্তি ফিসহ তাঁর প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
আলী আসগর বলেন, একবার বাচ্চা ভর্তি হওয়ার পর প্রতিবছর আবার ভর্তি ফি কেন? যাঁদের একের অধিক সন্তানকে বছরের শুরুতে ভর্তি করতে হচ্ছে তাঁদের অবস্থা করুণ। অভিভাবকদের এ বাড়তি টাকার জন্য ঋণ, ধারদেনা করতে হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই অবৈধভাবে ভর্তি ফির বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে অভিভাবকদের কাঁধে। অভিভাবকেরাও নিরুপায়। অভিভাবকদের কাছে সন্তানই সম্পদ। তাই সন্তানের জন্য যা যা করা সম্ভব সবই করার চেষ্টা করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীর একটি স্কুলে তাঁর দুই সন্তানের পুনর্ভর্তি বাবদ দিতে হয়েছে ৪১ হাজার ৪০০ টাকা। এর বাইরে ছিল মাসিক বেতন, বই-খাতা ও পোশাকের খরচ। বছরের শুরুটা এখন আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
একবার বাচ্চা ভর্তি হওয়ার পর প্রতিবছর আবার ভর্তি ফি কেন? যাঁদের একের অধিক সন্তানকে বছরের শুরুতে ভর্তি করতে হচ্ছে তাঁদের অবস্থা করুণ। অভিভাবকদের এ বাড়তি টাকার জন্য ঋণ, ধারদেনা করতে হচ্ছে।আলী আসগর, অভিভাবক
পুনর্ভর্তি ফি আদায়ের বিরুদ্ধে গত ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ আইন ও অধিকার এইড ফাউন্ডেশনের পক্ষে জনস্বার্থে রিট মামলা করেন ভুক্তভোগী আলী আসগর ও সাংবাদিক রাজু আহমেদ। এই আবেদনে বেআইনি অর্থ আদায় বন্ধ, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ও চলতি বছর আদায়কৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়।
আলী আসগর প্রথম আলোকে বলেন, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই স্কুলে পুনর্ভর্তি বাবদ প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। সরাসরি এ খাতে ফি নেওয়া ছাড়াও প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়ন ফি, রিলেশন বা সম্পর্ক ফি, স্কাউট ফিসহ বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্ভর্তি খাত উল্লেখ না করে সেশন ফি বাড়িয়ে বাড়তি টাকা নিচ্ছে। রাজধানীর উত্তরার একটি প্রতিষ্ঠানে চতুর্থ শ্রেণিতে (ইংলিশ ভার্সন) ভর্তি ফি, বেতন ছাড়া শুধু সেশন চার্জই নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অভিভাবকেরা এমন শত শত অভিযোগ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ আইন ও অধিকার এইড ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী আসগর রিট আবেদনে শিক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবাদী করা হয়। পরে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন নীতিমালা জারির কথা জানানো হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন নীতিমালার কপি হাতে পাওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে বাংলাদেশ আইন ও অধিকার এইড ফাউন্ডেশন সংবাদ সম্মেলন করে তা সবার সামনে তুলে ধরে।
তবে চলতি বছরে যেসব প্রতিষ্ঠান পুনর্ভর্তি ফি নিয়েছে, তা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নীতিমালায় কিছু বলা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
নতুন নীতিমালায় কোন খাতে ফি নেওয়া যাবে, কোন খাতে নয় এবং নিয়ম ভাঙলে কী শাস্তি হবে—তা উল্লেখ আছে। নীতিমালা না মানলে শাস্তি কী হবে, তা–ও বলা আছে। তবু অভিভাবকদের একাংশের প্রশ্ন, সরকারের পক্ষ থেকে আগেও প্রজ্ঞাপন, নীতিমালা, নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এবার নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন হবে কি না, সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
এ ছাড়া আরেকটি প্রশ্নও রয়ে গেছে, নীতিমালা কার্যকর কবে থেকে হবে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ নেই নীতিমালায়।
অভিভাবকদের ভাষ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়ন ফি নেয়, তবে কোথায় উন্নয়ন করা হয় তা আর অভিভাবকেরা জানতে পারেন না। সন্তানের কথা ভেবে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সত্ত্বেও তাঁরা মুখ বুজে টাকা দিচ্ছেন। এখন তাঁদের প্রত্যাশা, ঘোষণার বাইরে গিয়ে বাস্তবেই বন্ধ হোক পুনর্ভর্তি ফির এই চর্চা।