হামের উপসর্গ নিয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সন্তান নূর নাহারকে ভর্তি করিয়েছেন মা স্বর্ণা আক্তার। নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে
হামের উপসর্গ নিয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সন্তান নূর নাহারকে ভর্তি করিয়েছেন মা স্বর্ণা আক্তার। নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে

হামে ছয় মাসের শিশুর অবস্থা গুরুতর, মায়ের কাছে টাকা নেই, জানেন না কী করবেন

শয্যাসংকটে হাসপাতালের মেঝেতেই হামে আক্রান্ত শিশু নূর নাহারের মুখে নেবুলাইজ করছিলেন মা স্বর্ণা আক্তার। তাঁদের সঙ্গে আর কেউ নেই। স্বর্ণা আক্তারের চেখে পানি। জানতে চাই, কী হয়েছে? শিশুর বাবা কোথায়?

এই প্রশ্নে স্বর্ণা আক্তারের কান্না আরও বেড়ে গেল। দুই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল চোয়াল বেয়ে। তিনি বললেন, ‘বাবা থাইকাও নাই!’

পাশের শয্যায় থাকা অন্য আরেক রোগী বললেন, ‘উনি একাই এসেছেন। আর কেউ নাই।’

ছয় মাসের নূর নাহার হামে আক্রান্ত। তিন দিন ধরে তীব্র জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে। হাসপাতালে ভর্তির কথা বলায় স্বর্ণা আক্তারের স্বামী রাসেল (পেশায় ট্রাকচালক) বলেন, ‘আমি পারুম না।’ পাশাপাশি তিনি স্বর্ণা আক্তারকেও হাসপাতালে যেতে মানা করেন।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কথা হয় স্বর্ণা আক্তারের সঙ্গে। বেলা একটার দিকে তিনি হাসপাতালটিতে এসেছিলেন কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে।

তখন বেলা দুইটা। তখন পর্যন্ত তিনি কিছু খাননি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর ঘরে চাল, ডাল, তরকারি কিছুই ছিল না। বলেন, ‘রাস্তার থেন দুইডা বিস্কুট খাইছি।’

স্বামীর সহায়তা না পেয়ে হাসপাতালে আসার আগে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিয়ে এসেছেন স্বর্ণা আক্তার। হাসপাতাল পর্যন্ত আসতে গাড়িভাড়া ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার পর তাঁর কাছে বাকি ছিল ১০০ টাকা।

স্বর্ণা আক্তারের বয়স ২২ বছর। বাবা কৃষিকাজ করেন। চার বছর আগে নিজের পছন্দে রাসেলকে বিয়ে করেন। এর পর থেকে পরিবারের সঙ্গেও তেমন সুসম্পর্ক নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ছয় মাস বয়সী শিশুদের আদর্শ ওজন ৭ থেকে ৯ কেজি হওয়ার কথা। কিন্তু শিশু নূর নাহারের ওজন মাত্র তিন কেজি। দেড় মাস আগে ছিল চার কেজি।

অসুখে ওজন এতটা কমেছে বলে জানিয়ে স্বর্ণা আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী চিকিৎসা করাতে অনীহা দেখান। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করেন। পরে তিনি কিশোরগঞ্জে মায়ের বাড়িতে চলে যান।

সেখানে শিশুটির অবস্থার আরও অবনতি হলে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেন। ওষুধ খাওয়ানো হয়; কিন্তু কাজ হয়নি। পরে চিকিৎসকেরা ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দিলে সন্তানকে নিয়ে আবার কেরানীগঞ্জে ফেরেন স্বর্ণা।

অসুখ ভালো না হওয়ায় দুই সপ্তাহ আগে নূর নাহারকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান স্বর্ণা আক্তার। চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির নিউমোনিয়াও হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চার দিন থেকে টাকার অভাবে আবারও হাসপাতাল ছেড়ে কেরানীগঞ্জে চলে যান।

স্বর্ণা আক্তার জানান, সন্তান হওয়ার আগে বিভিন্ন বাসায় কাজ করতেন তিনি। সেই টাকা সংসারে দিতেন; কিন্তু সন্তান জন্মের পর আর কাজে যেতে পারেন না। এর পর থেকেই স্বামীর আচরণ বদলে যায়। কয়েক মাস ধরে বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতেও চাপ দিচ্ছেন রাসেল।

অসুস্থ নূর নাহারের অবস্থা গুরুতর। স্বর্ণা আক্তারের কাছে টাকা নেই। তাই সামনে কী করবেন, কোথায় যাবেন, কীভাবে সন্তানের চিকিৎসা চালাবেন—কোনো প্রশ্নের উত্তর জানেন না এই মা।

ঢাকার বাইরের রোগী বেশি

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছে ২৪ জন। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এর মধ্যে একজন হামের উপসর্গ নিয়ে, আরেকজনের হাম শনাক্ত হয়েছিল।

এই হাসপাতালে যেসব রোগী আসছেন, তাঁদের সবার তথ্য থাকলেও কে কোন জেলার সেটির বিস্তারিত তথ্য নেই। রোগী ভর্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ১০ এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭৩৩ জন।

এর মধ্যে ঢাকার রোগী ২২৬ জন। বাকি ৫০৭ জন ঢাকার বাইরের। ঢাকার পরে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জের।

হাসপাতালটিতে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৮ জনের। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, হাসপাতালটিতে বর্তমানে ৫০ থেকে ৫৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। হামের প্রকোপ আগের চেয়ে কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আশঙ্কা এখনো কাটেনি। তিনি ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন।