গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে মুন্নী আক্তারকে জেরা করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। জেরায় মুন্নী আক্তার বলেছেন, বাগেরহাটের শরণখোলা থানা থেকে তাঁদের বলা হয়েছিল যে তাঁর স্বামী মো. নজরুল ইসলামকে হাত–পা বেঁধে, পেট কেটে, সিমেন্টের বস্তা বেঁধে হত্যা করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ আজ বৃহস্পতিবার মুন্নী আক্তারকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গণী। এর আগে ৮ এপ্রিল এ মামলায় জবানবন্দি দেন মুন্নী আক্তার।
এ মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। আজ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরায় মুন্নী আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী নজরুল ইসলাম বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী বলে অন্য কোথাও বলেছেন কি না, তা তাঁর মনে নেই। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর স্বামী আসামি ছিলেন কি না, তা–ও তিনি জানেন না। এ কথা সত্য নয় যে তাঁর স্বামী হত্যার ঘটনায় জিয়াউল আহসানকে জড়িয়ে অসত্য সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও জেরায় উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে ৮ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে মুন্নী আক্তার বলেছিলেন, তাঁর স্বামী নজরুল ইসলাম পিলখানায় বিডিআর হাসপাতালে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় হত্যাকাণ্ড দেখে প্রাণভয়ে তিনি দেয়াল টপকে বের হয়ে যান। এরপর তিনি কেরানীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় যান। সেখান থেকে ফোনে তাঁর (স্ত্রী) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তাঁরা পিলখানা ১ নম্বর গেটের সামনে একটি বাসায় থাকতেন। সেখান থেকে তিনি তাঁর কাকির বাসা পোস্তগোলায় চলে যান। সেখান থেকে তাঁর মেয়েকে নিয়ে কেরানীগঞ্জে স্বামীর কাছে যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর মেয়েকে নিয়ে ঝালকাঠি বাবার বাড়িতে চলে যান।
মুন্নী আক্তার আরও বলেন, ২০১০ সালে তাঁর স্বামী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মধুমতি ক্লিনিকে চাকরি নেন। সেখানে স্টাফ কোয়ার্টারে একটি বাসা ভাড়া নেন। এরপর মেয়েকে নিয়ে তাঁরা সেখানে থাকতে শুরু করেন। সেখানে যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী আসল নাম গোপন করে নুরুল আমীন মুন্সী নাম ধারণ করে মধুমতি ক্লিনিকে চাকরি করছেন। তাঁর স্বামী প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতেন। ২০১০ সালের ১৫ মার্চ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি।
পরদিন মধুমতি ক্লিনিকে যান উল্লেখ করে জবানবন্দিতে মুন্নী আক্তার বলেন, জনৈক রুহুল আমীন শেখ তাঁর স্বামীর সঙ্গে কাজ করতেন। রুহুল আমীন বলেন, ২০১০ সালের ১৫ মার্চ কোটালীপাড়া বামতার মোড় এলাকায় সাদাপোশাকে ৫-৬ জন লোক মুন্নীর স্বামীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান এবং তাঁকে (রুহুল) মারধর করে সেখানে ফেলে রেখে যান। একদিন ঝালকাঠি থেকে ডিএসবির লোক এসে মুন্নীর শ্বশুরকে বলেন, তাঁর স্বামী নজরুল ইসলামের লাশ বাগেরহাটের শরণখোলার বলেশ্বর নদ থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
সংবাদপত্রে নজরুল ইসলামের লাশের ছবি দেখে তাঁকে তাঁর ভাই জাহিদুল ইসলাম শনাক্ত করেন উল্লেখ করে মুন্নী আক্তার জবানবন্দিতে আরও বলেন, আত্মীয়স্বজনসহ শরণখোলা থানায় গিয়ে তিনি স্বামীর পরিধেয় পোশাক শনাক্ত করেন। লাশ ফেরত চাইলে পুলিশ জানায়, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁর স্বামীর লাশ দাফন করা হয়েছে। পরে জেলা প্রশাসকের সহায়তায় ডিএনএ পরীক্ষার পর তাঁর স্বামীর লাশ কবর থেকে তুলে বাড়িতে এনে আবার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।