সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলো ভবনে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ দেখতে আসেন বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। শিল্পী বিশ্বজিৎ গোস্বামীসহ (মাঝে) আগত দর্শকেরা। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে
সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলো ভবনে শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ দেখতে আসেন বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। শিল্পী বিশ্বজিৎ গোস্বামীসহ (মাঝে) আগত দর্শকেরা। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে

প্রথম আলোর দগ্ধ ভবন নিয়ে শিল্প–প্রদর্শনীর দশম দিন

প্রদর্শনীর সিদ্ধান্ত সাহসী ও অনুপ্রেরণার

প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে শিল্প-আয়োজন

  • প্রদর্শনী চলবে ২ মার্চ পর্যন্ত।

  • প্রতিদিন বেলা ১১টা-১টা ও ৩টা-৫টা।

  • প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত।

সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলো ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে আয়োজিত এই শিল্প-প্রদর্শনী দেখতে গতকাল শুক্রবারও অনেক দর্শনার্থী এসেছিলেন। প্রদর্শনী আজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দিন সময় বাড়ানো হয়েছে। প্রদর্শনী চলবে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত।

গতকাল দশম দিনে বিকেলে প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। প্রদর্শনী দেখে হামিদা হোসেন বলেন, যারা হামলা করেছে, তারা সাংঘাতিক খারাপ কাজ করেছে। এটা সবাইকে দেখানো দরকার।

এর আগে সকালে আসেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ বিষয়ে লেখালেখি করছেন তিনি। প্রদর্শনী দেখে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বার্গম্যান লিখেছেন, ভারতবিরোধী ও মুক্ত গণমাধ্যমবিরোধী উগ্রপন্থীদের অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়া ভবনের ভেতরে প্রদর্শনীর আয়োজন করার সিদ্ধান্তটি একই সঙ্গে সাহসী ও অনুপ্রেরণামূলক। যাঁর মাথায় এই পরিকল্পনা এসেছে, তিনি সর্বোচ্চ প্রশংসার দাবিদার। আর যে শিল্পী এটিকে প্রাণ দিয়েছেন, তিনি জোরালো স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।

মবকে শুরুতেই থামিয়ে দিতে হবে

গুলশান সোসাইটির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওমর সাদাত প্রদর্শনীতে এসে বললেন, ‘যখন প্রথম আলোর ভবন পুড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল, আমি পুড়ছি, নিজের ভেতরে দহনটা আমি অনুভব করছিলাম।’ এ হামলাকে চিন্তা ও বাক্‌স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব ধরনের মবকে শুরুতেই থামিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি সবার বাক্‌স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের ‘আলো’ নামের এই প্রদর্শনী ২ মার্চ পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত।

প্রকৌশলী কাজী জাহিদুল হাসান প্রদর্শনী ঘুরে দেখে বললেন, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে সেই রাতের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। শিল্প–প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ ঘটনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে গেছে।

এ হামলা–ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ‘অচিন্তনীয়’ বলে উল্লেখ করে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার বলেন, প্রদর্শনী না দেখলে হামলার ভয়াবহতা বোঝা যেত না। গণমাধ্যমের ওপর এ ধরনের আঘাত সভ্য সমাজে চলতে পারে না।

ধ্বংসস্তূপ থেকে এই শিল্পকর্ম আয়োজনের প্রশংসা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শওকত হোসেন। বলেন, আক্রান্ত হওয়ার এক দিন পর পত্রিকা প্রকাশ করা একটি বড় অর্জন।

প্রদর্শনী দেখে আজকের পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই হামলা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ছন্দপতন।

প্রদর্শনী দেখছেন মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন

প্রথম আলো বাংলাদেশেরই কণ্ঠস্বর

বিকেলে ছেলে মেহেদী হাসানকে নিয়ে প্রদর্শনী দেখতে আসেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম। প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, প্রথম আলোর ওপর হামলা বাংলাদেশের ওপর হামলা। প্রথম আলো বাংলাদেশেরই কণ্ঠস্বর। এভাবে হামলা করে প্রথম আলোকে থামানো যাবে না।

প্রকৌশলী রোকসানা মহসিন সুমি ও প্রকৌশলী নাফিস আহমেদ দম্পতি উত্তরা থেকে এসেছেন প্রদর্শনী দেখতে। রোকসানা মহসিন বলেন, ‘এখানে এসে বুঝতে পারছি যে কী হয়েছে, হামলার ভয়াবহতা কেমন।’

ছেলে জয়দীপ দেবনাথকে নিয়ে প্রদর্শনী দেখতে এসেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রহ্লাদ দেবনাথ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে এসে হামলার ভয়াবহতা, নৃশংসতা উপলব্ধি করেছি তখন আসলে অবস্থা কেমন ছিল। ভবন পুড়িয়ে দেওয়ার এক দিন পর ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে তিনি ভীষণ আনন্দিত হয়েছেন বলে জানান।

এখনো পোড়া গন্ধ

হামলার শিকার প্রথম আলোর ভবনটিতে প্রবেশ করতেই এখনো পোড়া গন্ধ আসে। প্রবেশ করে বাঁ দিকে গেলে কিছু চিত্রকর্ম। একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ভবন। আরেকটি চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে পোড়া ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের পাশাপাশি সেখানে রাখা হয়েছে প্রথম আলোর পুড়ে যাওয়া কম্পিউটারসামগ্রী ও আসবাব।

প্রদর্শনীতে দোতলায় পোড়া বই প্রদর্শন করা হয়েছে। আগুনে যেসব বই পোড়েনি, সেগুলোও প্রদর্শন করা হয়েছে। অক্ষত বইয়ের প্রদর্শনীতে লেখা, ‘এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে’। দোতলার নথিপত্র, বই, আসবাব, যন্ত্রাংশসহ যাবতীয় ধ্বংসস্তূপের ওপর রয়েছে সাদা কফিন।

তৃতীয় তলায় পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড় প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি এই ফ্লোরের পোড়া বৈদ্যুতিক তার এবং অন্যান্য জিনিসও আছে। ওই সময় প্রথম আলোর যেসব কর্মী ভবন পুড়তে দেখেছেন, তাঁদের বক্তব্যও প্রদর্শিত হচ্ছে।

চতুর্থ তলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে প্রথম আলো ভবনে হামলার ভিডিও চিত্র। সেই সঙ্গে চতুর্থ তলায় উগ্রবাদীরা যে লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে, তা-ও প্রদর্শিত হচ্ছে। ভাঙচুর করা ও এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ওপর রয়েছে একঝাঁক কবুতর।