
মুর্তজা বশীর (১৭ আগস্ট ১৯৩২—১৫ আগস্ট ২০২০) সেই শিল্পীদের একজন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে শিল্পকলার সম্পর্ক বুঝতে হলে যাঁদের মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হয়। যৌবনে তিনি যখন শিল্পের পাঠ নিচ্ছেন, রাজনীতির দীক্ষাও হচ্ছে ঠিক একই সময়। তখন ১৯৫০–এর দশক। ভাষা আন্দোলনের আগুনে সারা দেশ তেতে উঠেছে। পতঙ্গের মতো সেই আগুনে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তত দিনে তিনি গাঁটছড়া বেঁধে ফেলেছেন মার্ক্সবাদে।
মুর্তজা বশীরের বাবা ছিলেন বাঙালি সমাজের বিরাট গর্বের প্রতীক ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। আশ্চর্য ও জটিল রসায়নে বাঁধা ছিল বাবা আর ছেলের সম্পর্ক। জীবনব্যাপী সে সম্পর্ক নানা বিচিত্র খাতে প্রবাহিত হয়েছে।
সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে মুর্তজা বশীরের দুটি বই—ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: বাবার কাছে ফেরা এবং একুশের লেখা একুশের আঁকা। বই দুটি যেন মুর্তজা বশীরের অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ জীবনের বিপরীত দুই প্রতিফলন। দুইয়ে মিলে তৈরি করেছে এক সম্পূর্ণ মুর্তজা বশীরের প্রতিকৃতি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: বাবার কাছে ফেরা বইটি মূলত বাবার সঙ্গে ছেলে মুর্তজা বশীরের পত্রালাপ, লেখা আর ড্রয়িং নিয়ে। বাবা আর ছেলে দুজনই খ্যাতিমান, কিন্তু বৈশিষ্ট্যে বিপরীত। পণ্ডিত বাবা চেয়েছেন ছেলে বেড়ে উঠুক পরিশীলিত সামাজিক হয়ে। ছেলে চাইলেন, নিজের পরিচয়ে নিজের জায়গা করে নিতে।
বইয়ের লেখা ও চিঠিগুলোতে বাবা-ছেলের দ্বান্দ্বিক অথচ গভীর সম্পর্কের নানা বাঁক আর অজানা ঘটনায় নিয়ে যায় আমাদের। বিখ্যাত বাবার সন্তান হিসেবে শৈশবের যে অহমিকা, চালচলনে যে ঔদ্ধত্য, পরবর্তী জীবনে তা কেটে গিয়েছিল। যৌবনে তিনি প্রবলভাবে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন বাবার প্রভাবের গণ্ডি থেকে।
আবুল খয়র মুর্তজা বশীরুল্লাহ, পিতৃপ্রদত্ত বংশীয় ভারিক্কি এই নামের মেদ ঝরিয়ে নিজেকে পাল্টে ফেলেন মুর্তজা বশীর। এ নিয়ে বাবার প্রশ্নের মুখে অকম্পিত গলায় সম্রাট শাহজাহানের সামনে বিদ্রোহী সন্তান আওরঙ্গজেবের মতো বলেছিলেন, ‘...উল্লাহ কেটে দিয়েছি। নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে চাই।’ পিতা খুশি হননি, তবে মেনে নিয়েছিলেন ছেলের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে। ঠিক করে দিয়েছিলেন নামের বানানও।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চাননি ছেলে শিল্পী হোক। তিনি জানতেন, এ পথ বড় বন্ধুর, মানবেতর ও কষ্টসাধ্য। ছেলে তখন সিদ্ধান্তে অবিচল ও দুর্বিনীত; শোষণমুক্ত সমাজ আর মানুষের মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত। ছেলের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মাথায় রেখে বাবা সম্মুখীন হলেন কঠিন দ্বন্দ্বের। কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বললেন, ‘বেশ। তবে সিনারি এঁকো।’ হাতে তুলে দিলেন আর্ট কলেজে ভর্তির টাকা।
এই বাবাই পরে এক প্রদর্শনীতে ছেলের ছবি দেখে ছুটে গিয়ে বলেছিলেন, ‘জানো, তোমার সেই ছবিটা কিছুতেই ভুলতে পারি না। আমার ভেতরটা নড়ে ওঠে।’
যৌবনের দুর্বিনীত সন্তান মুর্তজা বশীর শেষ বয়সে ফিরে এলেন এই উপলব্ধিতে, ‘আজ আমার বলতে মোটেই দ্বিধা নেই—আমি মুর্তজা বশীর, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র। কোনো কুণ্ঠা আজ এতে নেই।’
বইটি জুড়ে আছে এই বিখ্যাত পিতা-পুত্রের সম্পর্কের আশ্চর্য রসায়ন।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী প্রজন্মের উন্মেষ ঘটে পূর্ব বাংলায়, মুর্তজা বশীর ছিলেন তার সক্রিয় সদস্য। তরুণ এই শিল্পীর মনে ভাষা আন্দোলন কেটেছিল গভীর দাগ। এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি জীবনব্যাপী লিখেছেন এবং ছবি এঁকেছেন। সেসব লেখা আর আঁকার সংকলন একুশের লেখা একুশের আঁকা বইটি।
একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে তিনি ছিলেন। পুলিশের গুলিতে চোখের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছিলেন ভাষাশহীদ বরকতকে। মুখে তাঁর বৃষ্টির ফোঁটার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছিল। পানির মতো কলকল করে শরীর থেকে ঝরছিল রক্ত। ‘পানি পানি’ করে কাতরাচ্ছিলেন তিনি। ফিসফিস করে বলেছিলেন, ‘আমার নাম আবুল বরকত, বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন, পল্টন লাইন, আমার বাড়িতে খবর দিয়েন।’
মুর্তজা বশীর বরকতকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে দেখেছিলেন, স্ট্রেচারের ওপর ভাষাশহীদ রফিকের খুলি উড়ে যাওয়া লাশ।
পরের বছর ১৯৫৩ সালে মুর্তজা বশীর আর বিজন ভট্টাচার্য মিলে এঁকেছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় বেরোনো সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারীর জন্য। লিখেছিলেনও তাঁর চোখে অভিজ্ঞতার কথা।
সেই লেখা আর আঁকা ছিল শুরু। এরপর সারা জীবন বয়ে চলেছে এর চর্চা। একুশের দগদগে স্মৃতি আর ড্রয়িং–সংবলিত এই বই পাঠককে নিয়ে যাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক কালপর্বের উত্তাল মুহূর্তে।