অনলাইন কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট মডিউলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক
অনলাইন কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট মডিউলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক

প্রতারণা বন্ধ না করলে প্রত্যেকের কপালে শনির দশা আছে: প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক

প্রবাসী কর্মীদের নিয়ে দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সিন্ডিকেট ও প্রতারণা বন্ধ না করলে এজেন্সিগুলোর ‘কপালে শনির দশা আছে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি বলেন, অভিবাসন খাতে যাঁরা সিন্ডিকেট তৈরি করে অবৈধভাবে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছেন, তাঁরা অবিলম্বে সোজা হয়ে যান।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগ ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ হুঁশিয়ারি দেন নুরুল হক।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বেসরকারি সংগঠন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) যৌথ উদ্যোগে অনলাইন কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট মডিউলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রতারিত অভিবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য দ্রুত ও কার্যকর অভিযোগ প্রতিকারব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা।

সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে একজন প্রবাসীর কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এজেন্সিগুলো নিয়ে নেয়, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই হুঁশিয়ারি দেন প্রতিমন্ত্রী। নুরুল হক বলেন, ‘এই টাকা কি সিঙ্গাপুর অথরিটি নেয়? নো। ছয়টা ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে অথরাইজেশন করেছে। তারা চার্জ দিচ্ছে, সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করে তারা শতকোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছে।’

প্রবাসীদের জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া সিন্ডিকেট চক্রকে নিয়ন্ত্রণে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন নুরুল হক। প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতারক চক্রের সবাইকে ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কঠোর নজরদারিতে রেখেছে। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অনেক এজেন্সি লাইসেন্স নবায়নের মতো অনিয়ম করছে। সেটিকেও আর বরদাশত করা হবে না বলেও উল্লেখ করেন নুরুল হক। তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের প্রতি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। এ খাতে পুরোপুরি স্বচ্ছতা ফেরাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

বিএমইটি ও রামরুর যৌথ উদ্যোগে অনলাইন কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট মডিউলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের অতিথিরা

মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় চটকদার ও ভুয়া বিজ্ঞাপনদাতাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছে উল্লেখ করেন নুরুল হক। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদেশে পাঠানোর বিজ্ঞাপন দেওয়া স্পষ্টত আইনবিরোধী। এসব প্রতারণা রুখতে বিএমইটিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে দরিদ্র প্রবাসীদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে নুরুল হক বলেন, এ ধরনের অপকর্ম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

দেশে প্রায় তিন হাজার রিক্রুটিং লাইসেন্সধারীর মধ্যে অধিকাংশই অনিয়মে জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঠিকভাবে নিয়ম মানলে চার-পাঁচ শর বেশি লাইসেন্স টিকবে না। ভুয়া ও অনিয়মে জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলসহ অভিবাসন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।

অনলাইন অভিযোগব্যবস্থা চালু হলে প্রবাসীদের হয়রানির ন্যায়বিচার ত্বরান্বিত হবে বলে উল্লেখ করেন রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি সংস্থাটির এক গবেষণার ফলাফল উল্লেখ করে বলেন, তাঁরা দেখেছেন, প্রায় ৫১ শতাংশ অভিবাসী কোনো না কোনোভাবে প্রতারণার শিকার হন। এ ছাড়া ১৯ শতাংশ অর্থ দিয়েও বিদেশে যেতে পারেননি এবং ৩২ শতাংশ বিদেশে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী মনে করেন, অনলাইন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু হওয়ায় এখন ক্ষতিপূরণ আদায়ের পরিমাণ ১০ গুণ বাড়বে।

তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বিভিন্ন প্রতারণার কারণে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নারী অভিবাসনের সংখ্যা প্রায় ৪১ শতাংশ কমে গেছে। নতুন এই মডিউলের মাধ্যমে প্রবাসীরা ঘরে বসেই অনলাইনে অভিযোগ প্রদান ও এর অগ্রগতি ট্র্যাক করতে পারবেন। এতে বারবার অফিসে আসার হয়রানি কমবে এবং অভিবাসন খাতে সুশাসন নিশ্চিত হবে।

প্রবাসীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের একান্ত প্রচেষ্টা থাকে, কোনো প্রবাসী যেন প্রতারণার শিকার না হন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেকেই প্রতারণার শিকার হন। তাই প্রবাসীদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে তাঁরা কোনো দালাল চক্রের প্রতারণা বা ফাঁদে পা না দেন।’

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ। তিনি বলেন, প্রবাসীদের কাছে থেকে তাঁরা যেসব অভিযোগ পান, সেগুলোর বেশির ভাগেরই সত্যতা থাকে। বিদেশে নেওয়ার কথা বলে টাকা আত্মসাৎ, দেশে প্রবাসীর নিজেদের সম্পদ বেদখল, আবার কেউ প্রবাসে নিখোঁজ, এমন অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আসে। নতুন এই পদ্ধতিতে প্রবাসীরা ঘরে বসেই যেকোনো অভিযোগ দিতে পারবেন বলেও উল্লেখ করেন মোখতার আহমেদ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক জামিল আহমেদ বলেন, এখন থেকে বিশ্বজুড়ে প্রবাসীরা অনলাইনে সরাসরি অভিযোগ প্রদান এবং অভিযোগ কোন স্তরে আছে, সেটা সহজে জানতে পারবেন। বিএমইটি ২০২৫ সালে ম্যানুয়ালি ৫০০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করে প্রবাসীদের ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এনে দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে নিজেদের বিড়ম্বনার কথা বলেন সৌদিপ্রবাসী হাফিজুরের স্ত্রী বীথি আক্তার ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী হিসেবে অভিযোগ দিয়ে প্রতিকার পাওয়া মো. মজুমদার আলী।

অনলাইন কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট মডিউলটি বিএমইটি, রামরু ও সিসটেক ডিজিটাল লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে। ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের এই নতুন মডিউল দেশের সব জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডেমো) এবং বিএমইটির কেন্দ্রীয় অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসবে।

এর মাধ্যমে অভিযোগের প্রতিটি ধাপ অনলাইনে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা সেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নতুন এই মডিউলের মাধ্যমে অভিবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অনলাইনে অভিযোগ দাখিল, প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র আপলোড, অভিযোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নোটিফিকেশন গ্রহণ করতে পারবেন। অন্যদিকে বিএমইটি কর্মকর্তারা অভিযোগ নিবন্ধন, তদন্ত, মধ্যস্থতা বা সালিশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিষ্পত্তি, পরিবীক্ষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়নের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় পরিচালনা করতে পারবেন।