
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের মধ্যেও থেমে থাকেনি ছবি আঁকা, কবিতা লেখা কিংবা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা। ২০২৪ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আঁকা ৬৩টি ছবি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে কবি ও মঞ্চ অভিনেতা চূড়ান্ত সাহার একক চিত্রপ্রদর্শনী।
‘দেয়ালজুড়ে সাদা নৈঃশব্দ্য’ শিরোনামের এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে চূড়ান্ত সাহার অসুস্থতার অভিজ্ঞতা, জীবনের বিচিত্র অনুভূতি, মানুষের সংগ্রাম ও সংবেদনশীলতার নানা দিক। অন্যদিকে চূড়ান্তর পরবর্তী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ৪০ লাখ টাকার বেশি। শিল্পের ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছানোর এই আয়োজন তাই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনসংগ্রামের পাশে দাঁড়ানোরও একটি উপলক্ষ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে গত শুক্রবার শুরু হয় তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী। আজ রোববার প্রদর্শনীর শেষ দিন। সাংস্কৃতিক সংগঠন গণকৃষ্টি আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে চূড়ান্তর আঁকা ছবির পাশাপাশি আছে তাঁর লেখা কবিতার আবৃত্তি ও চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন।
একটি ছবি কখনো মনের কথা বলে, কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চূড়ান্তর ৬৩টি ছবিতেও আছে তেমন নানা অনুভূতির প্রকাশ। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া নানা অভিজ্ঞতা, অসুস্থতার সঙ্গে বসবাস এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রামের প্রতি সংহতি এসব ছবিতে প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আয়োজকেরা।
আয়োজক দলের সদস্য মাইমুনা বলেন, ‘চূড়ান্ত সব সময়ই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে আগ্রহী। কবিতা, গল্প, নাটক সবই তাঁর কাছে এই যোগাযোগের মাধ্যম। এই আয়োজন যোগাযোগের চেষ্টারই অংশ।’ তাঁর প্রত্যাশা, প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে আরও বেশি মানুষ চূড়ান্তর শিল্পচর্চা ও জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে জানতে পারবেন। একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসার জন্য সহায়তা নিয়েও মানুষ এগিয়ে আসবেন।
চূড়ান্ত সাহা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের (৪৬তম আবর্তন) শিক্ষার্থী। কবিতা লেখা, আবৃত্তি, মঞ্চে অভিনয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিচিতি পেয়েছেন।
কবিতার মাসিক পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠন গণকৃষ্টি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা ছিল চূড়ান্ত সাহার। ‘স্বর্ণবোয়াল’ ও ‘নিমজ্জন’সহ বিভিন্ন নাটকে মঞ্চ অভিনেতা ছিলেন তিনি। ২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৈকুণ্ঠ হঠাৎ করে চিৎকার করে—কেউ আছো?’। দ্বিতীয় বই ‘পরোক্ষ যাত্রী ও তিনটি কবিতা’ প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালের বইমেলায়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে চূড়ান্ত সাহার সাইনোনাসাল কার্সিনোমা নামের বিরল ক্যানসার শনাক্ত হয়। রোগটি তাঁর মুখের বাঁ পাশের নাক ও নাকের আশপাশের চোখ এবং চোয়ালের অংশে ছড়িয়ে পড়ে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা তাঁকে দেশের বাইরে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর ওই বছরের নভেম্বর থেকে ভারতের বেঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।
চিকিৎসার প্রথম ধাপে চূড়ান্ত সাহাকে কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন দেওয়া হয়। প্রায় চার মাস ধরে এসব চিকিৎসা নেওয়ার পরও ক্যানসার পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। পরে আক্রান্ত অংশে অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী সময়ে কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার প্রথম ধাপে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা কষ্ট করে এই অর্থের জোগান দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন আরও ৪০ লাখ টাকার বেশি। পরিবারের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় চূড়ান্তর চিকিৎসায় সহায়তার জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী, সহপাঠী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর সহযাত্রীরা।