তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। তবে এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি করাও সম্ভব হচ্ছে না। কেননা যাদের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, সেই তথ্য কমিশনই গঠন করা হচ্ছে না। ফলে শুধু অভিযোগের নিষ্পত্তিই নয়, তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্রকাশনা ইত্যাদিও প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।
ছোটখাটো রুটিন কাজ করে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে তথ্য পাওয়ার অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছে না।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ প্রণয়নের পর তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং তথ্য প্রদানে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবারই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কমিশন কার্যত নেতৃত্বহীন ও অচল অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
এ পটভূমিতে আজ ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। ‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ: অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। তথ্য কমিশনেও দিবসটি নিয়ে একটি আলোচনা সভা হওয়ার কথা।
প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার নিয়োগের জন্য গত ৯ জুলাই পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি কম।
গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, এক মাসের মধ্যে স্বাধীন তথ্য কমিশন গঠন করা হবে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানার জন্য গতকাল যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, যাচাই–বাছাই কমিটি আবেদন আহ্বান করে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছে। এখন যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। আশা করা যায়, তাড়াতাড়িই তথ্য কমিশন গঠন করা সম্ভব হবে।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে নাগরিকদের। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী তথ্য চেয়ে নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পেলে, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য পেলে কিংবা তথ্যের আবেদনের বিষয়ে সন্তোষজনক সাড়া না পেলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশন প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও শুনানি করতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, জরিমানা আরোপ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের। ফলে তথ্য অধিকার আইনের বাস্তব প্রয়োগে কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে তথ্য কমিশন কার্যকর না থাকায় শুধু নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেই অসুবিধা হচ্ছে না, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।রিজওয়ান-উল-আলম, সহযোগী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
কিন্তু কমিশনে কোনো কমিশনার না থাকায় এসব অভিযোগের শুনানি হচ্ছে না। ফলে তথ্য পাওয়ার জন্য আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া নাগরিকদের অভিযোগও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এতে তথ্য অধিকার আইনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তথ্য কমিশনের এক কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এখন সাড়ে ৮০০ অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু কমিশন না থাকায় এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি হচ্ছে না। গত জুলাই পর্যন্ত অভিযোগ ছিল ৭৮০টি। এখন কেবল রুটিন প্রশাসনিক কাজেই সীমাবদ্ধ কমিশন।
তথ্য কমিশন অচল থাকায় শুধু অভিযোগ নিষ্পত্তি বা জনসচেতনতামূলক কাজই বন্ধ হয়নি, কমিশনের নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধান তথ্য কমিশনার আবদুল মালেক ও তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম একই বছরের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। এরপর আরেক তথ্য কমিশনার মাসুদা ভাট্টিকেও বাদ দেওয়া হয়। এরপর দুই বছরেও নতুন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন গঠন করেনি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার সাত মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিশন গঠন করা হয়নি। তবে গত জুলাইয়ে আপিল বিভাগের এক বিচারপতিকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। আইন অনুযায়ী, এই কমিটির কাজ হলো প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা। এরপর রাষ্ট্রপতি তাঁদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেবেন।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ প্রণয়নের পর তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং তথ্য প্রদানে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবারই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কমিশন কার্যত নেতৃত্বহীন ও অচল অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিজওয়ান-উল-আলম প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তথ্য কমিশন কার্যকর না থাকায় শুধু নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রেই অসুবিধা হচ্ছে না, এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলেছিল। কিন্তু তাদের সময়েই সুশাসনের অন্যতম হাতিয়ার নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তথ্য কমিশন পুরোপুরি অকার্যকর ছিল। হয়তো তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের একধরনের ভয় কাজ করেছে।
রিজওয়ান-উল-আলম বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের কথা বলেছে। কিন্তু দলটি ক্ষমতায় আসার সাত মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তথ্য কমিশন এখনো কার্যত অচল। অবশ্য কমিশন গঠনের লক্ষ্যে বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। আশা করা যায়, যত দ্রুত সম্ভব কমিশন গঠন করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।