ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নামে ভুল তথ্য ও ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। এতে দাবি করা হচ্ছে, টিআইবি জানিয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে।
বিষয়টি গোচরে আসার পর টিআইবি নিজের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, টিআইবির তথ্য খণ্ডিতভাবে প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ভোটের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য বলে মূল্যায়ন করেছেন দেশি–বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা।
আজ সোমবার টিআইবি ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে নির্বাচনের সামগ্রিক বিষয় জানাতে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। তাতে জাল ভোটের প্রসঙ্গটি আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত টিআইবির জেষ্ঠ্য গবেষণা ফেলো মো. মাহফুজুল হক সংবাদ সম্মেলনেই বলেন, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত আসনে একটাও ঘটনা হলে সেটা রেকর্ড করা হয়েছে। এটা আসনের পার্সেন্টেজ, ভোটের পার্সেন্টেজ না।
এরপরও ফেসবুকে টিআইবির বরাতে ছড়িয়ে পড়ে–২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে। কোনো কার্ডে লেখা হয়– ‘টিআইবির প্রতিবেদনে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য: জাল ভোট ২১.৪%’। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও এমন ফটোকার্ড তৈরি করে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এ নিয়ে ফেসবুক পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জাল ভোট পড়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ ও প্রতিপক্ষের এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে ১৪.৩ শতাংশ।
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর উপ প্রেস সচিবের দায়িত্বপালনকারী আশরাফুল আলম খোকনও একই দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, ‘ইউনূসের বিশ্বের সেরা নির্বাচনে ভোট পড়েছে ২৪.৬৪ শতাংশ। এটা আমাদের কথা না, টিআইবি এই রিপোর্ট দিয়েছে। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী…নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়া হয় ২১.৪ শতাংশ এবং ভোটের আগেই বক্সে সিল মারা ব্যালট ভরে রাখা হয়েছে ১৩.৪ শতাংশ। অর্থাৎ ৩৪.৮ শতাংশই ভুয়া ভোট।’
‘নির্বাচনে জাল ভোট পড়েছে ২১.৪ শতাংশ:টিআইবি’ এই দাবি করে সংবাদমাধ্যমের একাধিক ফটোকার্ড একাধিক পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকেও রিপোস্ট ও শেয়ার করা হচ্ছে।
যাচাই করে দেখা গেছে, নির্বাচন নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণের একটি খণ্ডিত অংশ ধরে এই ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে।
টিআইবির এই সংবাদ সম্মেলনের খবর জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে রয়েছে। তাতে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং-এর উদ্দেশ্যে মোট ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে প্রতিনিধিত্বশীলন নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন নমুনা হিসেবে নির্বাচন করে টিআইবি।
এই সম্পর্কিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাল ভোটসংক্রান্ত তথ্য দেখে টিআইবি তাদের ওয়েবসাইটে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, সেখানে টিআইবির নামে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে সতর্ক করা হয়েছে সবাইকে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট পড়া নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)- কে উদ্ধৃত করে ভুল ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ” শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যকে ভুলভাবে প্রচার ও প্রকাশ করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।’
জাল ভোটসংক্রান্ত তথ্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টিআইবির মাঠপর্যায়ের গবেষণার জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এ তথ্যকে পুরো নির্বাচনে ২১.৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে—এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্পূর্ণ ভুল, ভিত্তিহীন ও অমূলক।
যেসব সংবাদমাধ্যম এই তথ্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা বা উপস্থাপন করেছে, তাদের যথাযথ সংশোধনী প্রকাশের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে টিআইবি। নইলে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে বিবেচনা করা হবে, বলেছে সংস্থাটি।
* সংশোধনী: ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭ টা ১৪ মিনিটে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি পরিমার্জন করে একই দিন রাত ৯টা ৩১ মিনিটে প্রকাশ করা হলো।