
হবিগঞ্জে ‘জুলাই পদযাত্রা’ করতে যাওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের গাড়িবহরে হামলা ও সংঘাতের মধ্যে ভুয়া ভিডিও–ছবি ছড়াতে দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভিডিও হবিগঞ্জের বলে চালানো হচ্ছে। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা ছবিও ছড়াচ্ছে।
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মাস জুলাইয়ে সারা দেশে ‘জুলাই পদযাত্রা’ করছে এনসিপি। গতকাল মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এই কর্মসূচি পালনের পর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলা হয়। হামলার জন্য ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা–কর্মীদের দায়ী করেছে এনসিপি।
এর প্রতিবাদে আজ হবিগঞ্জসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে এনসিপি। হবিগঞ্জ বিএনপি ও ছাত্রদলও কর্মসূচি ডাকে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন হবিগঞ্জ শহরে সব ধরনের সভা–সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।
এই উত্তেজনার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ‘বেলা তিনটার পর থেকে হবিগঞ্জের অবস্থা ভয়াবহ। হবিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি জি কে গউছের বাসায় হামলা ও ভাঙচুর চালাচ্ছে এনসিপি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা।’
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
ভিডিওতে দেখা যায়, সড়কের ওপর একাধিক মোটরসাইকেল পড়ে আছে। রাস্তার পাশে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটি পুলিশ ভ্যানে কয়েকজনকে তোলা হচ্ছে, আশপাশে কয়েকজনকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পুরো ভিডিওজুড়ে সাইরেনের শব্দ শোনা যায়।
ভিডিওটির কি-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চে ২৮ জুলাই ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং একাধিক সংবাদমাধ্যমে একই ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে এটি পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ঘটনার ভিডিও হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনও পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চলমান আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। এতে ২৭ জুলাই অন্তত ২৫ জন এবং ২৮ জুলাই আরও পাঁচজন নিহত হন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় নিহত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
লিংক: এখানে
এ ছাড়া, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে থাকা লোগো ছিল জাগরণ নিউজ নামে। জাগরণ নিউজের ফেসবুক পেজে ‘আজাদ কাশ্মীরের মিরপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত ১২ পাকিস্তানি’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে, যা ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
লিংক: এখানে
হবিগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহরে হামলার ঘটনার পর সারজিস আলমের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে তাঁর হাত ও পায়ে ব্যান্ডেজ, একটি হাত গলায় ঝোলানো এবং তাঁকে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দাবি করা হয়, এটি হামলায় আহত হওয়ার পরের ছবি।
যাচাইয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সারজিস আলমের প্রকৃত ছবি ও ভিডিও পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, ভাইরাল ছবি এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত মূল ছবির পটভূমি, পোশাক ও দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি একই হলেও ভাইরাল ছবিতে অতিরিক্তভাবে হাতের স্লিং, ব্যান্ডেজ ও ক্রাচ যুক্ত করা হয়েছে।
প্রথম আলো প্রকাশিত মূল ছবিতেও তাঁর হাতে বা পায়ে কোনো ব্যান্ডেজ কিংবা ক্রাচ দেখা যায়নি। একইভাবে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতেও তাঁকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে ও বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।
ভিডিও লিংক: এখানে
এরপর ছবিটি এআইভিত্তিক ইমেজ বিশ্লেষণ টুল দিয়ে পরীক্ষা করা হলে টুলটি ছবিটিকে সম্পাদিত হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর জুলাই পদযাত্রায় হবিগঞ্জে হামলার ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন—এমন দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
গতকাল হবিগঞ্জে সংঘাত হলেও কারও নিহত হওয়ার খবর কোনো সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
যাচাইয়ে দেখা যায়, একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ১৭ জুন একই ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। ভিডিওটির দৃশ্য ভাইরাল দাবিতে প্রচারিত ভিডিওর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
লিংক: এখানে
পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্র মেহেদী হাসানের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের আহাজারির দৃশ্য।
প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধানে ১৭ জুন প্রকাশিত একাধিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও একই ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাস থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসানের (১৪) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, মুঠোফোন চুরির অপবাদ দিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে মারধর করে হত্যা করেছে।