‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব নিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীরা
‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব নিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীরা

আলোচনা সভায় বক্তারা

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়া নয়, ঐকমত্য ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে তা নতুন সুযোগ তৈরি করবে। তবে সম্ভাব্য এই যোগদান নিয়ে তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের। তাঁরা বলছেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতির ভিত্তিতে।

আজ সোমবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার বিডিবিএল ভবনে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান: কৌশলগত জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব নিকাশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভার আয়োজন করে ভয়েস ফর রিফর্ম। এতে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কূটনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সামরিক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আন্তকার্যক্ষমতা (ইন্টারঅপারেবিলিটি) তৈরির সুযোগ রয়েছে। যৌথ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানেও বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।

পাশাপাশি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বেশ কিছু ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতকে তার সামরিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে নতুন করে হিসাবের মধ্যে রাখতে হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতেও একই থাকবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশকে ঝাঁপিয়ে পড়ার কিছু নেই। তবে ৫৫ বছর ধরে নানা দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ রাখার পরও বাংলাদেশের এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বন্ধুরাষ্ট্র নেই, যে নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে একটি সমষ্টিগত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আসা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

‘হুজুগে’ যোগদান নয়

সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী মনে করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলেই বাংলাদেশের সব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। তাঁর মতে, দেশের মানুষ এ চুক্তির পক্ষে থাকলেও ‘হুজুগে হাইপ তুলে’ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য সুফল-ঝুঁকি নিয়ে যথাযথভাবে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সরকার এখনো পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করছে না উল্লেখ করে সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার না করে মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশ্লেষণ জরুরি

তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ট্রাম্পের অভিনন্দনও গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অধ্যাপক সিদ্দিকী মনে করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সংসদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা এবং জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি আলোচনায় আসার পর থেকেই এর বিরোধিতাকারীদের অনেকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর উদাহরণ টানছেন। তাঁদের ভাষ্য, এ ক্ষেত্রে কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আক্রান্ত সদস্যকে সহায়তা করার জন্য অন্য সদস্যদেশগুলোর প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে আর্টিকেল ৫ মূলত সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে সম্মিলিতভাবে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হবে, সেই কাঠামো নির্ধারণ করে। তবে এতে কোনো দেশের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন অধ্যাপক শাহাব এনাম খান। তাঁর মতে, কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

‘পরীক্ষা’

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক উপপ্রধান জন এফ ড্যানিলোউইজ মনে করেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিএনপি সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন, তাদের দেখাতে হবে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে কীভাবে একটি বৃহৎ নীতিগত অবস্থান থেকে বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া যায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। আরও বক্তব্য দেন এফএসডিএসের মুখ্য গবেষণা ফেলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাফায়াত আহমেদ, মানবাধিকারকর্মী রুবি আমাতুল্লাহ, নেক্সাফ ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের সভাপতি হাসান ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসির, সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদ, এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমিন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দিন হোসেন প্রমুখ।