বাল্যবিবাহ
বাল্যবিবাহ

আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস

তানিয়া যেভাবে নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে দিল

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যরা যখন কলেজে ভর্তির অপেক্ষায়, তখন সাতক্ষীরার তানিয়া ব্যস্ত ছিল নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকানোর চেষ্টায়। এরই মধ্যে প্রকাশিত হয় এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে শুধু জিপিএ–৫-ই নয়, সব বিষয়ে এ–প্লাস নিয়ে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে সে। রসায়নে ১০০–তে ১০০, পদার্থবিজ্ঞানে পেয়েছে ৯৯।

তবে দুর্দান্ত এ সাফল্যে তার মধ্যে কোনো আনন্দই ছিল না। মাথায় ঘুরছিল নিজের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা। সবশেষে অবশ্য শিক্ষকদের সহায়তা এবং এসএসসিতে অসাধারণ ফলাফলের কারণে এ যাত্রায় বাল্যবিবাহের হাত থেকে রেহাই মেলে প্রতিবাদী তানিয়ার।

আজ রোববার আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করো, মেয়েদের অধিকারে বিনিয়োগ করো’। তবে দেশের চিত্র যেন কিছুটা ভিন্ন কথাই বলে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ জরিপ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)-২০২৫ বলছে, দেশে বাল্যবিবাহের হার ২০১৯ সালে ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ নামলেও ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয় ১৮ বছর এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ১৫-১৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীর হার ছিল ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ। ৭ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে কিশোরী জন্মহারও। প্রতি হাজার কিশোরীর বিপরীতে বছরে সন্তান জন্মহার ২০১৯ সালে ছিল ৮৩টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯২।

তানিয়ার গল্প

মোসাম্মত তানিয়া খাতুন, বয়স ১৭। এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে তানিয়া জানতে পারল বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে। নিজের ও মায়ের এ বিয়েতে অমত থাকলেও পরিবারের অন্যরা বেশ চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, পরিবারের অভাব-অনটন, সমাজে মেয়েদের অনিরাপত্তাসহ নানা কিছু। তানিয়া কী করবে, ভেবে পাচ্ছিল না। চাপের মধ্যে শেষমেশ বলে ফেলে, এক শর্তে সে রাজি হতে পারে—তাকে বিয়ের পর লেখাপড়া করাতে হবে। কিন্তু সেই শর্তও মানতে চায়নি ছেলেপক্ষ।

তানিয়ার বিয়ের আলাপ ছড়িয়ে পড়ে স্কুল ও আশপাশের এলাকায়। আশার আলো নিভতে থাকে একটু একটু করে। তবে গল্পের মোড় ঘুরে যায় ভালো ফলাফলের মিষ্টি নিয়ে যখন তানিয়া ও তার মা পৌঁছালেন স্কুলের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির শিক্ষক আকলিমা খাতুনের কাছে।

তানিয়া বলল, ওই শিক্ষক তার মাকে বলেছিলেন, ‘এত ভালো রেজাল্ট করল, মেয়েটাকে এভাবে বিয়ে দিয়ে দেবেন? মেয়েকে আমরা পাঁচ বছর ধরে পড়িয়েছি। আমাদেরও মেয়ের ওপর একটা অধিকার আছে।’ পরে তিনি, শিক্ষক ফয়েজুল হক ও স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী সাকিবুর রহমান তানিয়ার পরিবারকে বোঝাতে থাকেন।

একপর্যায়ে তাঁরা তানিয়াকে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে যান। ইউএনও তাঁর পরিবারকে বোঝান। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি হওয়ায় তানিয়ার বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে পরিবার।

সাকিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তানিয়ার এ লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার স্নাতকোত্তর মা। তিনি এ বিয়ের বিপক্ষে ছিলেন শুরু থেকেই। একজন শিক্ষিত মা-ই পারেন এ ধরনের প্রতিকূলতায় সবচেয়ে বড় সাহস হতে।

তানিয়া সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। এসএসসিতে ভালো ফলের কারণে বিনা মূল্যে প্রাইভেট পড়ার সুযোগও পেয়েছে।

তানিয়ার গল্প অনুপ্রেরণার। তবে ভিন্ন গল্পও দেখতে পাওয়া যায় অহরহ। বাল্যবিবাহের পেছনে মূল কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক রীতি এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। তবে জন্মনিবন্ধনের ঘাটতিও একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালের এক জরিপে জানা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশের জন্মনিবন্ধন হয়েছে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী নারীর ন্যূনতম বিয়ের বয়স ১৮ ও পুরুষের ২১। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্কর সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের নির্দেশ ও অভিভাবকের সম্মতি থাকলে বিধিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কম বয়সে বিয়ে হলে তা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে অপরাধ বলে গণ্য হয় না।