মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক থাকাকালে বরিশালের র্যাব–৮–এ কিছু অস্ত্র-গুলি দিয়ে রেখেছিলেন, যার কোনো হিসাব করা হতো না বলে জেরায় উল্লেখ করেছেন সাক্ষী মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। সাবেক র্যাব কর্মকর্তা সাব্বির রহমান আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জিয়াউল আহসানের আইনজীবীর জেরায় এ কথা বলেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরায় সাব্বির রহমান বলেন, ‘আমাদের র্যাব-৮–এর অভিযানের সময় যদি কোনো গুলি খরচ হতো, তা রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হতো। তবে জিয়া স্যার কিছু অতিরিক্ত অস্ত্র–গুলি আমাদের দপ্তরে (বরিশালের র্যাব–৮) দিয়ে রেখেছিলেন, যার কোনো হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো না।’
জিয়াউল আহসান ওই অস্ত্র–গুলি কোথা থেকে আনতেন, সে বিষয়ে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান বলেন, ‘এই অতিরিক্ত অস্ত্র–গুলিগুলো আনা হয়েছিল ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার জব্দকৃত আলামত থেকে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় কী কী অস্ত্র ছিল, তা আমার জানা নেই।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ১৩তম সাক্ষী সাব্বির রহমান। ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাব্বির রহমানের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। আজ তাঁকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. সাহিদুর রহমান।
২০০৯ সালের অক্টোবরে সাব্বির রহমান র্যাব-৮ বরিশালে উপ–অধিনায়ক হিসেবে যোগ দেন। তখন র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন হাসান মাহমুদ খন্দকার এবং গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান। ২০১৩ সাল পর্যন্ত সাব্বির র্যাবে দায়িত্ব পালন করেন।
‘বললে আমার পরিণতিও সেই মাঝির মতো হতো’
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ (হত্যা) করার নির্দেশ পাওয়ার পর তা প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেননি বলে জেরায় উল্লেখ করেছেন মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। আজ জেরায় তিনি বলেন, ‘কারণ, আমার ভয় হচ্ছিল যে তাহলে আমার পরিণতিও আলকাছ মাঝির মতোই হবে।’
১৭ সেপ্টেম্বর জবানবন্দিতে মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ২০১১ সালের জুন মাসে জিয়াউল আহসান তাঁকে ফোন করেন। ফোনে ‘গলফ কাজে’ (কোনো ব্যক্তিকে হত্যার পর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে বা সাগরে ফেলে দিয়ে লাশ গুম করাকে গলফ অপারেশন বলা হতো) নিয়োগপ্রাপ্ত মাঝিদের অন্যতম আলকাছ মাঝির বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চান। উত্তরে তিনি জানান, এই মাঝির ব্যাপারে তাঁর কিছু জানা নেই। এতে জিয়াউল আহসান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আলকাছ মাঝি গলফ অপারেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে, যা র্যাবের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করেছে।’ এ কথা বলে জিয়াউল আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ দেন।
বিষয়টি শোনার পর শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে তিনি অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন বলে জানান সাব্বির রহমান। সপ্তাহখানেক পর ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছ থেকে জানতে পারেন, জিয়াউল ফোনে ডেকে নেওয়ার পর থেকে আলকাছ মাঝিকে আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
‘আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান করিনি’
আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরায় আজ সাক্ষী সাব্বির রহমান বলেন, আলকাছ মাঝি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তাঁর স্ত্রী জিডির (সাধারণ ডায়েরি) অনুলিপি র্যাবের কাছে দাখিল না করায় তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অনুসন্ধান করেননি। তাঁরা আলকাছ মাঝির মোবাইলের কললিস্ট ধরে অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে আর অগ্রসর হতে পারেননি।
২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের ধইঞ্চাবাড়ী এলাকায় র্যাব–৮ অভিযান করেছিল কি না, তা মনে নেই বলে জেরায় উল্লেখ করেন সাব্বির রহমান। জেরায় তিনি বলেন, সেই অভিযানে তিনি ছিলেন কি না, তা–ও তাঁর মনে নেই। অভিযানের বিষয়ে সেদিন প্রথম আলো পত্রিকায় মুঠোফোনে তিনি কোনো সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন কি না, সেটাও মনে নেই।
সাব্বির রহমান বলেন, এ কথা সত্য নয় যে ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাজু বাহিনীর সঙ্গে র্যাবের বন্দুকযুদ্ধে চারজন নিহত হন। এর মধ্যে আলকাছ মাঝিও ছিলেন।
সাব্বির রহমান বলেন, এ কথাও সত্য নয় যে আলকাছ মাঝি কখনো মাঝি ছিলেন না এবং তিনি বনদস্যু ছিলেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান। তিনি গ্রেপ্তার আছেন। আজ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।