এইচআইভি (এইডস)
এইচআইভি (এইডস)

রোহিঙ্গাদের এইচআইভি শনাক্ত বাড়ছে, উদ্বেগ জনস্বাস্থ্যবিদদের

দেশে ২০২৫ সালে এইচআইভি শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ শতাংশই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ। দেখা গেছে, দুই বছর আগের চেয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের সংখ্যা অনেকটাই বেশি। বর্তমান অবস্থান, আর্থ–সামাজিক পরিস্থিতি, চিকিৎসা সুবিধা, সচেতনতা ইত্যাদি নানা নিরিখে রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের এই হারকে উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অভিমত, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও সরকারেও এ বিষয়ে অনেক বেশি সজাগ হতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এইচআইভি শনাক্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের। এর ফলে শুধু রোহিঙ্গা নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীরও স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক এইডস দিবসের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেশে এইচআইভি–এইডস পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এটি তুলে ধরেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস–এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. খায়রুজ্জামান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস শুরু করে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১ হাজার ৮৯১ জনে পৌঁছেছে। গত দেড় দশকের মধ্যে বার্ষিক হিসাব ধরলে এ সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। এই সংখ্যা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও সমাজ বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শনাক্তের হার উদ্বেগের কোণে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট শনাক্তের মধ্যে ২১৭ জন মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ। এটি বাংলাদেশে মোট শনাক্তের ১১ শতাংশ।

২০১৭ সালে সীমান্তচৌকিতে ‘রোহিঙ্গা জঙ্গিদের’ হামলার অজুহাত তুলে গণহত্যা শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। তখন প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরেও অনেকে এসেছে। আগে থেকেও অনেক রোহিঙ্গা ছিল। তাদের আর নিজ দেশে ফেরানো যায়নি। দুবার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছিল, তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। বরং গত দেড় বছরে নতুন করে এসেছে দেড় লাখের কাছাকাছি রোহিঙ্গা।

এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের একাংশ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকে মানব পাচারকারীদের শিকার হচ্ছে। খুন, ধর্ষণের ঘটনা একের পর এক ঘটছে। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। ছড়িয়ে পড়ছে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র। এদিকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তাও দিন দিন কমছে। কারণ, আন্তর্জাতিক সহায়তা আগের মতো নেই। শিশুদের পড়ানোর অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।

এইচআইভি শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে রোহিঙ্গাদের

রোহিঙ্গাদের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি খুব নাজুক ছিল আগে থেকেই। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও শঙ্কাজনক। রোহিঙ্গা আসার পর আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় সহযোগিতায় তাদের শিবিরগুলোতে স্বাস্থ্যসুবিধা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় মা থেকে শিশুতে এইচআইভি/এইডস ও অন্যান্য রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধে (পিএমটিসিটি) কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই জরুরি সহায়তায় গর্ভবতী মায়েদের স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়।

পিএমটিসিটির কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ জানান, ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৬৯ হাজার ১৬৭ জন গর্ভবতী মাকে পরীক্ষা করে ৩৪ জনের এইচআইভি পজিটিভ হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ৩৮ হাজার ৮৮৯ জনের স্ক্রিনিংয়ের পরে এইচআইভি শনাক্ত হয় ১৮ জন গর্ভবতী মায়ের।

আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৪ সালে রোহিঙ্গাদের মোট ১৪৯ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫৮।

সেই তুলনায় ২০২৫ সালে শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে।

এইচআইভি বৃদ্ধির কারণ কী

রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি বৃদ্ধির হার উদ্বেগজনক। এই হার বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে প্রথম আলোকে বলেন কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহম্মদুল হক। তিনি বলেন, এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি যত বাড়ছে সেটা উদ্বেগজনক নিঃসন্দেহে। এর মূল কারণ তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার যথেষ্ট অভাব আছে। বিশেষ করে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের অনীহা ব্যাপক।

ডা. মোহম্মদুল হক মনে করেন এই বৃদ্ধির হার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তাঁর কথা, এই ঝুঁকি প্রশমনে সরকারের চেষ্টার কমতি নেই। এখন রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে জোর দেওয়া হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের অনেকেই শিবিরের বাইরে আছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অনেকেই মিশে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো। এরই পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মধ্যে সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের কম হার বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন ওই শিবিরে কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক চিকিৎসক। তবে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাসামগ্রী বৃদ্ধির হার তাদের মধ্যে বাড়ছে বলে জানায় স্থানীয় সূত্র। রোহিঙ্গারা আসার সময় এসব সামগ্রী ব্যবহারের হার ৫ শতাংশ হলেও এখন প্রায় ৪০ শতাংশ বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া সত্যিকার অর্থেই উদ্বেগজনক। শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষের জন্যও এটা ঝুঁকির। কারণ অনেক রোহিঙ্গাই শিবিরের বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ে বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষদের সংস্পর্শে আসছেন ও চলাফেরা করছেন। এখানে ঝুঁকিটা অনেক বেশি।

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডসের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান মনে করেন, রোহিঙ্গাদের জনস্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করেই ওই জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের হার কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিরোধ সম্ভব। আর তা করতে হলে দেশি–বিদেশি সহায়তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।