ফুলের আশপাশে ওড়াউড়ি করছে মৌমাছি
ফুলের আশপাশে ওড়াউড়ি করছে মৌমাছি

মানুষের কথা

মৌমাছিদের দুর্দিন চলছে

কীটনাশক ব্যবহারের কারণে শুধু মৃত্যু নয়, মৌমাছিদের সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি তৈরি করে। 

এবার জানকবুল প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমাদের ব্যর্থতা আর আশা হারানোর কথা লিখব না। পজিটিভ হয়ে যাব রম্য লেখক শিবরাম চক্রবর্তীর মতো। মৃত্যুশয্যাতেও ডাক্তারের প্রশ্নের জবাবে বলতে শিখব ‘ফার্স্ট ক্লাস আছি’। এখন দিনের বেলা রেলগাড়িতে করে ঘোরার মজাই আলাদা। গত ১৮ জানুয়ারির কথা। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পেরিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া যেতেই দুই পাশে চোখজুড়ানো শর্ষে ফুলের চাদর। আগে শর্ষে ফুলের গন্ধ রেলের জানালা দিয়ে কামরায় পৌঁছে যেত। তখন রেলের গতি কম ছিল আর জানালা খোলা-বন্ধে যাত্রীদের স্বাধীনতা ছিল। এখন ট্রেনের গতি বেশি। তার ওপর জানালা খোলা যায় না। তাই ফুলের রং দেখেই শান্ত থাকতে হয়। 

ট্রেনের জানালা দিয়ে বাদাম, ‘বয়েল ডিম’ মাটির খুরিতে গরম চা, পাকা কলা, ঝুড়িভাজা কেনার দিন শেষ। মোড়কে মোড়ানো চিপস আর কোমল পানীয় নিয়ে কামরায় কামরায় ঘুরে বেড়ায় ঠিকাদারের লোকজন। ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে ট্রেন থেমে গেল আরেকটি ট্রেন যেতে দেওয়ার জন্য। কোনো ঘোষণা নেই—কেন থামল? কতক্ষণ দাঁড়াবে? জানলাম ঘোষণা যা দেওয়া হয়, সবই রেকর্ড করা। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষণার কোনো রেওয়াজ নেই। দরজা খুলে দু-একজনকে নামতে দেখে আমরাও নামলাম। ভাজা বাদাম, ‘বুদ্ধি করে’ পাকানো কলার দরদাম করতে করতে দেখা হয় টাঙ্গাইলের সন্তোষের হামিদ আলীর সঙ্গে। হামিদ আলী
মৌসুমি মৌচাষি। 

অনেক বছর আগে মধুপুরের এক ট্রেনিং সেন্টারে হামিদ আলীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁর শ পাঁচেক মৌবাক্স আছে। টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ঘুরে ঘুরে এই মৌসুমে তিনি শর্ষে/ধনিয়া /কালোজিরা ফুলের মধু সংগ্রহ করেন। লিচুর ফুল এলে চলে যান নাটোর, লালপুর, পাকশী, ঈশ্বরদী। পদ্মা সেতু হওয়ার পর একবার দেখা হয়েছিল ভাঙ্গা, মুকসুদপুরে। 

হামিদ আলীর মন খারাপ; তিনি লুকাতে জানেন না মন খারাপের ছবি। তাঁর বেজার মুখে ফুটে উঠেছে চরম হতাশার রেখাগুলো। তিনি প্রতিবারের মতো এবারও গিয়েছিলেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘী ইউনিয়নে। সেখানকার উকিয়ারা গ্রামের আবুল মিয়ার সঙ্গে তাঁর অনেক দিনের ‘শেয়ার’। দুজন মিলে প্রায় ৯০০ বাক্সের চাষবাস। এক এক বাক্সে ৫০-৬০ হাজার মৌমাছি। এখন (মাঠ ভরা ফুলের সময়) প্রতি বাক্সে দিনে এক লিটার মধু পাওয়ার কথা। মধু দূরে থাক, মৌমাছি মারা যাচ্ছে কাতারে কাতারে। কিন্তু কেন? হামিদ আলী তাঁর সরল ভাষায় বলেন, ভূত; ভূত লেগেছে শর্ষে ফুলে। অল্প বিদ্যা নিয়ে নানা বাগধারা আছে। তবু আমার অল্প বিদ্যার ওপর ভর করে বলে ফেলি, ‘মিথাইল সিলিসাইলেট পানিতে গুলে দিলেই তো মৌমাছি বাঁচানো যায়।’ কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেলেন হামিদ আলী। ‘কোনো কিছুতেই কাম হচ্ছে না—ইটা তো একারাইন নয় যে মিথাইলে কাজ হবে। (একারাইন রোগ প্রাপ্তবয়স্ক মৌমাছিদের হয়ে থাকে। একরাপিস নামের এককোষী পরজীবী মৌমাছির কণ্ঠনালি বা শ্বাসনালিতে ঢুকে দেহের ভেতরের তরল পদার্থ খেয়ে ফেলে এবং ডিম পাড়ে। ফলে মৌমাছির শ্বাসনালি কীটাণু ভর্তি হয়ে পড়ে। ক্রমেই শ্বাস বন্ধ হয়ে মৌমাছি মারা যায়।)

হামিদ আলী বলে চলেন, ‘একারাইন ধরলে তো একেবারে মরে না; উড়তে অসুবিধা হয়, পা টেনে টেনে হাঁটে, হুলুদ হুলুদ পায়খানা করে; ডানা অবশ হয়ে যায়।’

অনেক শব্দ করে অন্য ট্রেন চলে গেল পাশের প্ল্যাটফর্ম দিয়ে। শব্দে আমি যেন হামিদ আলীর বুকভাঙা কান্না শুনলাম। ট্রেনে উঠে বসে ফোন করি ঘিওরের কৃষি নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘প্রকৃত কৃষি’র দেলোয়ার জাহান ভাইকে। তিনি জানালেন, পরীক্ষা না করে সঠিক করে মন্তব্য করা যাবে না। কথা দিলেন খোঁজ নেবেন। 

সিরাজগঞ্জ জেলার কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেল, শর্ষেখেতে নির্বিচার কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে মৌমাছি মৃত্যুর প্রধান কারণ। হামিদ আলীরও ধারণা তা–ই। কীটনাশক সব সময় ছিটানো হয়, কিন্তু এবার কেন মৌমাছির এমন ক্ষতি হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞরা জানালেন, দিনের বেলায় ওষুধ ছিটানোর কারণে মৌমাছি মারা পড়ছে। বাক্সের মৌমাছি সূর্য ওঠার পর থেকে আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত মাঠের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে থাকে। বিকেলের মধ্যেই মৌমাছিগুলো তাদের বাক্সে ফিরে যায়। কৃষকেরা বিকেলে শর্ষেখেতে কীটনাশক ছিটালে মৌমাছির কোনো ক্ষতি হতো না। কৃষকদের অসচেতনতার জন্য এমনটা হয়েছে। বিভিন্ন জেলার কৃষি বিভাগ দাবি করছে, তারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলার শর্ষে চাষিদের এ বিষয়ে সচেতন করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। 

মাঠপর্যায়ে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা শর্ষের ফলন বৃদ্ধির জন্য খেতে ভিটামিনজাতীয় কীটনাশক ছিটিয়েছেন। কিন্তু এই কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মৌমাছিগুলো মারা যাবে—এ কথা তাঁদের জানা ছিল না। 

কীটনাশকের কারণে শুধু মৃত্যু নয়, মৌমাছির সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি তৈরি করে। 

শৈত্যপ্রবাহ বা একারাইন রোগজনিত মৌমাছির মৃত্যুর সংকট চেষ্টা করলে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত মৌমাছি মৃত্যু ছাড়াও মৌমাছির স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে, ফলে তারা দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয় এবং মৌচাকে ফিরতে পারে না। 

কীটনাশক বহনকারী মৌমাছি মৌচাকে ফিরলে বিষ পুরো কলোনিতে ছড়িয়ে পড়ে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমায়। নতুন প্রজন্মের মৌমাছির বিকাশে বাধা দেয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একবার কীটনাশকের সংস্পর্শে এলেও মৌমাছির পরবর্তী প্রজন্মকে সুস্থ হতে কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে, যা তাদের টিকে থাকার জন্য বড় হুমকি। 

মধু ও মোম বিষাক্ত হতে পারে

বিজ্ঞানীরা বলছেন, শর্ষেখেতে ব্যবহৃত কীটনাশক মৌমাছির মাধ্যমে মধুতে মিশে যেতে পারে, যা মৌমাছি ও মধু উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর; কীটনাশক মৌমাছির শরীরে, পরাগরেণু ও নেক্টারে লেগে থাকে এবং সেখান থেকে মৌচাকে স্থানান্তরিত হয়ে মধু ও মোমকে দূষিত করতে পারে, যার ফলে মধু খাওয়ার জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে। তা ছাড়া কিছু কীটনাশক (যেমন: নিওনিকোটিনয়েড) গাছের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ফুল থেকে সংগৃহীত নেকটার ও পরাগরেণুতে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান থাকে, যা মৌমাছিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এখনো সময় আছে 

মৌমাছি ও মধুশিল্পের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনার ঝুঁকি এখন স্পষ্ট। টাঙ্গাইলের হামিদ আলী হয়তো ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না, কিন্তু অন্য হামিদরা যেন তাঁর মতো হারিয়ে না যান, সেদিকে আমাদের নজর দেওয়া জরুরি। সব প্রচারমাধ্যমে শর্ষেখেতে কীটনাশক প্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রচার জোরদার করতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের মাঠকর্মী ও কর্মকর্তাদের শর্ষে চাষিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে। তাঁদের জানাতে হবে 

• ফুল ফোটার সময় কীটনাশক স্প্রে করা ঠিক নয়। যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে সন্ধ্যায়, যখন মৌমাছিরা আর সক্রিয় থাকে না, তখন কীটনাশক প্রয়োগের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। 

• জৈব কীটনাশক যা মৌমাছির জন্য কম ক্ষতিকর যেমন নিমবীজের নির্যাস ইত্যাদি ব্যবহার সবার জন্য কম ক্ষতিকর। 

# লেখক গবেষক wahragawher@gmail.com