এইচআইভি এইডস
এইচআইভি এইডস

এইচআইভি খাতে অর্থায়ন কম: ঝুঁকির মুখে প্রতিরোধ কর্মসূচি

বাংলাদেশ এইচআইভির অত্যন্ত নিম্ন সংক্রমণপ্রবণ দেশের মধ্যে আছে। জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কম মানুষ এইচআইভি আক্রান্ত বলে অনুমান করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে।  বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে যেমন সুচ ব্যবহারকারী, সমকামী ও সমলিঙ্গ সম্প্রদায় এবং অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের হার বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে এইচআইভি শনাক্তের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। আর গত বছরে (২০২৫) নতুন শনাক্তের সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

এই শনাক্তের হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় এখনো কম হলেও স্থানীয়ভাবে এটিকে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কিন্তু দেশের শনাক্তের হার বাড়লেও এইচআইভি–এইডস প্রতিরোধে অর্থায়ন সেই তুলনায় অনেক কম। এটা বৈশ্বিকভাবেও ঘটছে। অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং দেশীয় বরাদ্দ পর্যাপ্ত হারে না বাড়ায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম চাপে পড়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সার্বিকভাবে এইচআইভি শনাক্ত হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা কম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই হার বৃদ্ধিকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। এ খাতে বৈশ্বিক সহায়তা কম হলেও দেশীয় অর্থায়ন বাড়ানো দরকার। এ সমস্যা বাড়তে পারে, কারণ আমাদের দেশে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আছে।

এইচআইভি শনাক্ত বাড়ছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৯৮৯ সালে এক ব্যক্তির এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর পর থেকে প্রতিবছরই এইচআইভি শনাক্ত হওয়া ব্যক্তি পাওয়া গেছে। দু-এক বছর এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা কমে গেলেও বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাই ছিল বেশি। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণের বছর বাদ দিলে গত ১০ বছরে এইচআইভিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৭৬। পরের বছর অর্থাৎ, ২০২৪ সালে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮। আর সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৮৯১।

দেশে অর্থের জোগান কমছে

‘বাঁচতে হলে জানতে হবে’—এই স্লোগান মূলত এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিচালিত একটি ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন। এটি গত শতকের ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে বাংলাদেশে এইডস–ভীতি ও ভুল ধারণা দূর করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এইচআইভি–এইডস সচেতনতায় এমন একটি বিজ্ঞাপনের কথা হয়তো অনেকেরই স্মরণে আছে। এমন কোনো প্রচার এখন আর নেই। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, দিন দিন এইচআইভির সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতায় এমন প্রচারের ভূমিকা দরকার। সেই সঙ্গে দরকার আনুষঙ্গিক নানা তৎপরতা। কিন্তু এর সরবরাহ কোথায়? দিন দিন এ খাতে বরং কমছে সহায়তা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন এইচআইভি এইডস খাতটি বেশি পরিমাণ দৃষ্টি দেওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু এখন বেশি উপেক্ষিত। এমন কোনো সিরিয়াস কর্মসূচি নেই, যার কথা বলতে পারেন। এ পরিস্থিতি চললে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়বে। এটা সরকারের উপলদ্ধি করা প্রয়োজন।

দেশে এইচআইভি–এইডস প্রতিরোধে অর্থের বড় জোগানদাতা ছিল বিদেশি উৎস। এর মধ্যে ২০০৪ সালে গ্লোবাল ফান্ডের বড় সহায়তা ছিল। সেই সহায়তা ধীরে ধীরে অনেক কমে গেছে। আরেকটি বড় সহায়তা ছিল ইউএসএইডের। সেটি বন্ধ হয়ে গেল ২০১৩ সালে। আর জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডস এইচআইভি–এইডস নিয়ে মূল কার্যক্রমে কারিগরি সহায়তা দিত। এই সংগঠন চলতি বছরের মে মাসে বন্ধই হয়ে যাচ্ছে।

২০০৪ সালে ২০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ গ্লোবাল ফান্ড থেকে পায় বাংলাদেশ। ২০১৬ সাল থেকে তা কমতে থাকে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বাংলাদেশে বাৎসরিক সহায়তা ১০ মিলিয়ন থেকে কমে ৭ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডসের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান প্রথম আলোকে বলেন, দিন দিন এইচআইভি–এইডস খাতে সহায়তা কমছে। এ খাতে সরকারি বরাদ্দও অপ্রতুল। এখন বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এইডস প্রতিরোধের কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।

প্রভাব কী পড়ছে

এইচআইভি–এইডস খাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর একটি হলো হিজড়া জনগোষ্ঠী। এ জনগোষ্ঠীর অধিকারকর্মী জয়া সিকদার জানান, ২০০৪ সালের দিকে তিনি এইচআইভি প্রকল্পেই প্রথম অধিকারকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই প্রকল্পের বড় দিক ছিল হিজড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা। কারণ, গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, এ জনগোষ্ঠীর অনেকেরই একাধিক যৌনসঙ্গী থাকেন। একটা সময় ঢাকায় অন্তত আটটি ড্রপ ইন সেন্টারের মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীর যৌনকর্মীরা স্বাস্থ্য–সুবিধা পেতেন। এখন এই ড্রপ ইন সেন্টারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারটিতে।

জয়া সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, দুই কোটি মানুষের এই শহরে মাত্র চারটি ড্রপ ইন সেন্টার একেবারেই কম। স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকটি যখন আরও বেশি নজরে নেওয়া দরকার, তখন তা সংকুচিত হয়েছে। এ খাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ার ফলেই এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

এইচআইভি–এইডস খাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় যৌনকর্মীদের সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠন এবং তাদের নানা কর্মসূচি কমে যাচ্ছে। এর কারণ অর্থসহায়তা নেই। এখনো যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরাও তাঁদের কাজ অনেকটাই কমিয়ে এনেছেন বলে জানান ভাসমান যৌনকর্মীদের পরিষেবা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (পিএসটিআই) হেড অব প্রোগ্রামস মো. মাহবুবুল আলম।  তিনি জানান, ভাসমান যৌনকর্মীদের জন্য আগে এই শহরে পাঁচটি ড্রপ ইন সেন্টার ছিল, এখন দুটি কমে গেছে।

শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন যৌনপল্লীতেও যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য থাকা কর্মসূচি সংকুচিত হয়ে গেছে। এইচআইভি–এইডস প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এমন একাধিক কর্মসূচি ছিল।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস খাতে বরাদ্দ কমছে, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যাই নয়; জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায্যতা এবং মানবাধিকারের ইস্যু। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নিলে নতুন সংক্রমণ, চিকিৎসার অভাব ও প্রতিরোধ কার্যক্রমের ফাঁক বিপুল পরিমাণে বাড়তে পারে। তাই অর্থায়নের পুনর্বিন্যাস, কার্যকর বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পুনরুদ্ধার এখন সময়োপযোগী উদ্যোগের অংশ হওয়া উচিত।