
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে জন–আস্থা পুনরুদ্ধারে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে লেখা এক খোলাচিঠিতে এ আহ্বান জানান সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।
আজ বুধবার লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে খোলাচিঠিটি প্রকাশ করা হয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে পাঠানো এই চিঠিতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অব্যাহত অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জীবনের সুরক্ষা, ব্যক্তির নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সভা-সমাবেশের অধিকার রক্ষায় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নির্বাচনের আগে এই অধিকারগুলো পুরোপুরি সুরক্ষায় আইন, নীতি ও বিধান কার্যকর করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে দেশটির ওপর থাকা বাধ্যবাধকতা মেনে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ম্যান্ডেট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের রয়েছে। সরকার সেই দায়িত্ব পালন করবে কি না, তা প্রমাণে আগামী কয়েকটি সপ্তাহ হবে চূড়ান্ত পরীক্ষা।
অ্যামনেস্টি মহাসচিব আরও বলেন, নির্বাচনের সময়সহ ব্যক্তি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর অবাধে কথা বলার অধিকার কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নাগরিকেরা যাতে পুরোপুরি এবং নির্ভয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় দিতে হবে। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলে, শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশের জন্য কাউকে যেন জীবনের ভয়ে থাকতে না হয়, সরকারকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ মূল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলোর স্বাক্ষরকারী হওয়া সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী প্রশাসন সেই বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার–সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) অন্যতম, যা নির্বাচনের সময়সহ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়।
চিঠিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, মৌলিক স্বাধীনতার ওপর এমন বেআইনি বিধিনিষেধ জনসাধারণের মুক্ত আলোচনা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। পাশাপাশি এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থাও কমিয়ে দেয়।
২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ সাংবাদিক ও সমালোচকদের দমনে কঠোর ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনের (এটিএ)’ অপব্যবহার করেছে বলে চিঠিতে অভিযোগ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলমের (পান্না) কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁকে ২০২৫ সালের আগস্টে ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাতের চেষ্টার’ অভিযোগে এই আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ ছাড়া ডিসেম্বরে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ‘আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর’ অভিযোগে একই আইনে আটক করা হয়। অ্যামনেস্টির মতে, এই দুই সাংবাদিকের এমন স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার তাঁদের মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চিঠিতে গত ১৮ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান বিন হাদি নিহতের পর সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশাসনের অপর্যাপ্ত ভূমিকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। ওই দিন দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল এবং নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তা করা হয়। একই দিন ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক হিন্দু ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়।