
মৃত স্ত্রী-সন্তানকে দেখতে কারাবন্দী জুয়েল হাসান সাদ্দামের সাময়িক মুক্তি না পাওয়া নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের এই নেতার প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু তিনি সেই সুযোগ না পাওয়ায় সমালোচনাও চলছে।
গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে জুয়েল হাসানের বাড়ি থেকে তাঁর স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ এবং ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই সন্তানের জন্মের আগে থেকে জুয়েল কারাগারে রয়েছেন।
জুয়েলের বাড়ি বাগেরহাটে হলেও তিনি এখন আছেন যশোর কারাগারে, স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় তিনি থাকতে পারেননি। পরে স্বজনেরা গতকাল শনিবার দুপুরে মা ও ছেলের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেন, জুয়েল সেখানে স্ত্রী-সন্তানকে শেষবারের মতো দেখেন।
জুয়েলের স্বজনেরা দাবি করেছেন, স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় অংশ নিতে তাঁর প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয়েছিল, কিন্তু প্রশাসনের সাড়া মেলেনি।
তবে প্রশাসনের ব্যাখ্যা ভিন্ন রকম। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন বলছে, তাদের কাছে একটি আবেদন এলেও তারা সেটি যশোরে জমা দিতে বলেছিলেন জুয়েলের পরিবারকে। যশোরের কারা কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁদের কাছে আবেদনটি আসেনি।
তবে এই ঘটনার পর প্যারোলে মুক্তি কীভাবে হয়, তার অনুমতি কে দেন, তা নিয়ে সবার মনেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
প্যারোল কী
প্যারোল শব্দটি ফরাসি, এর শাব্দিক অর্থ প্রতিশ্রুতি। আইনের পরিভাষায় এর মানে শর্তের অধীনে মুক্তি দেওয়া। নির্দিষ্ট কোনো শর্তসাপেক্ষে কোনো আসামিকে সাময়িকভাবে মুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়াকে প্যারোল বলা হয়।
বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্যারোল–সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে। বন্দীরা কারাগারে যে কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকে, সেই কারা অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান।
প্যারোলে মুক্তির নীতিমালা বিভিন্ন সময় হালনাগাদ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ নীতিমালাটি করা হয় ২০১৬ সালের ১ জুন। এটি এখনো কার্যকর রয়েছে বলে কারা কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
জুয়েল যে জেলার কারাগারে রয়েছেন, সেই যশোর জেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়নে এখনো ২০১৬ সালের নীতিমালাটি পাওয়া যাচ্ছে।
প্যারোলের অনুমতি কে দেন
নীতিমালা অনুসারে কারাবন্দীদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের, তিনি একই সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটও। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো বন্দী জেলার কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে ওই জেলার অভ্যন্তরে যেকোনো স্থানে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন।
অন্যদিকে কোনো বন্দী নিজ জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক না থেকে অন্য জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনা করে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন।
কখন প্যারোলে মুক্তি পাওয়া যায়
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভিআইপি বা সব শ্রেণির কয়েদি/হাজতি বন্দীদের কাছের আত্মীয় যেমন মা–বাবা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে।
এ ছাড়া আদালতের আদেশ কিংবা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্তে প্যারোলে মুক্তির প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্দীকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে।
কতক্ষণ মুক্ত থাকা যায়
মুক্তির সময়সীমা কোনো অবস্থাতেই ১২ ঘণ্টার বেশি হবে না বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে। এটাও বলা আছে যে নিরাপত্তা ও দূরত্ব বিবেচনায় প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ সময় নির্ধারণ করবেন।
এ ছাড়া বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার মুক্তির সময়সীমা কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে।
মুক্ত বন্দীর পাহারায় কে থাকে
প্যারোলে মুক্ত বন্দীকে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারায় রাখতে হবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে। কারা ফটক থেকে পুলিশ প্যারোলে মুক্ত বন্দীকে গ্রহণ করেন। অনুমোদিত সময়সীমার মধ্যেই আবার কারাগারে বুঝিয়ে দেন।
জুয়েলের ক্ষেত্রে কী হয়েছিল
জুয়েল হাসানের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুয়েলের স্ত্রী ও সন্তান মারা যাওয়ার পর আমরা কারাগারে যোগাযোগ করি। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি।’
এ নিয়ে সমালোচনা ওঠার পর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন প্রথম আলোর প্রশ্নে বলেন, ‘প্যারোলের একটি আবেদন নিয়ে এসেছিল। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। যেহেতু সে আছে যশোরের কারাগারে, আবেদন করতে হবে সেখানকার (যশোরের) জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে।’
বিষয়টি জুয়েলের স্বজনদের বুঝিয়ে বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন মো. বাতেন।
এদিকে সমালোচনার মুখে যশোর জেলা প্রশাসন প্যারোলে জুয়েলের মুক্তি না পাওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়।
তাতে বলা হয়, আবেদনের পরও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, এ ধরনের তথ্যও মিথ্যা। কারণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর বরাবর প্যারোলে মুক্তিসংক্রান্ত কোনো আবেদনই করা হয়নি।
যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক হাসান প্রথম আলোকে বলেন, জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে লিখিত বা মৌখিক কেউ কোনো ধরনের আবেদন করেননি।
প্যারোলের আবেদন না থাকার পরও পরিবারের মৌখিক আবেদনে মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে কারা ফটকে জুয়েলকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয় বলে যশোর কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন প্রথম আলোর যশোর প্রতিনিধি ও বাগেরহাট প্রতিনিধি