কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মেলার শিল্পকর্ম দেখছেন শিল্পী অধ্যাপক সৈয়দ আবুল বার্‌ক্ আলভী। রোববার সন্ধ্যায় লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে
কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মেলার শিল্পকর্ম দেখছেন শিল্পী অধ্যাপক সৈয়দ আবুল বার্‌ক্ আলভী। রোববার সন্ধ্যায় লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে

কলাকেন্দ্রে ছাপচিত্রের মিলনমেলা, পথিকৃৎদের বিশেষ প্রদর্শনী

ছাপচিত্র নিয়ে উৎসবে বর্ণাঢ্য হয়ে আছে কলাকেন্দ্রের পরিবেশ। নিচতলায় নবীন শিক্ষার্থীরা বিপুল উৎসাহ–উদ্দীপনা নিয়ে ধাতব পাতে নকশা খোদাই করছেন, মেশিনে ছাপ তোলার মতো কাজে মেতেছেন। পাশেই চলছে দেশের ছাপচিত্রকলার পথিকৃৎ শিল্পীদের বিশেষ প্রদর্শনী। আর ওপরে বিশাল পরিসরে ছাপচিত্র মেলা। শিক্ষার্থী, তরুণ প্রজন্মের শিল্পী, শিক্ষক আর কলানুরাগী দর্শকদের সমাগমে প্রতিদিন বিকেল থেকে কলাকেন্দ্র হয়ে উঠছে উৎসব মুখর।

১ মে থেকে রাজধানীর লালমাটিয়ার ডি–ব্লকের ৯/৩ বাড়ির কলাকেন্দ্র আয়োজন করেছে মাসব্যাপী ছাপচিত্র মেলা। কলাকেন্দ্রের পরিচালক শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান জানালেন, মে মাসজুড়েই প্রদর্শনী, কর্মশালা, আলোচনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চলবে। এর মধ্যে খ্যাতনামা চার শিল্পীর প্রথম দিকের ছাপচিত্র নিয়ে শুরু হয়েছে বিশেষ প্রদর্শনী। বিদেশে এ ধরনের প্রদর্শনী সাধারণত সরকারি উদ্যোগেই আয়োজিত হয়। এখানে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পথিকৃৎ শিল্পীদের কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তাগিদ থেকেই এই বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আর কিবরিয়া প্রিন্টমেকিং স্টুডিওর আয়োজনে চলছে ১৪তম কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলা। এবার মেলার পরিসর আরও বেড়েছে। এরপর ১২ মে থেকে সমকালীন ছাপচিত্র নিয়ে আরও একটি প্রদর্শনী শুরু হবে।

ছাপাই ছবির পথিকৃৎ

বাংলাদেশের আধুনিক ছাপচিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ, ছাপচিত্রের নতুন শিল্পভাষার নির্মাতা শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া, অগ্রগণ্য শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুল ইসলামের ছাপচিত্র নিয়ে শুরু হয়েছে ‘ছাপাই ছবির পথিকৃৎ’নামের বিশেষ প্রদর্শনী। চলবে ২৩ মে পর্যন্ত।

দর্শকেরা এখানে আধুনিক চিত্রকলায় ছাপচিত্রকলার প্রথিতযশা শিল্পীদের প্রথম পর্যায়ের কাজগুলো দেখার দুর্লভ সুযোগ পাবেন। এর অনেকগুলো কাজই আগে প্রদর্শিত হয়নি। ফলে যাঁরা নিয়মিত শিল্পকর্ম প্রদর্শনী দেখে থাকেন, তাঁদের জন্যও নতুন কিছু রয়েছে এখানে।

সফিউদ্দীন আহমেদের কাজগুলো ‘উডএনগ্রেভিং’ মাধ্যমে করা। পদ্ধতিগতভাবে ‘উডএনগ্রেভিং’ ও ‘কাঠখোদাই’–এর মধ্য বেশ ভিন্নতা আছে। দর্শকেরা এই পার্থক্য অনুভব করতে পারবেন সফিউদ্দীন আহমেদ ও রফিকুন নবীর কাজগুলো দেখলে। রফিকুন নবী করেছেন কাঠখোদাই পদ্ধতিতে। সফিউদ্দীন আহমেদের কাজগুলো গত শতকের চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের। সাদাকালোতে করা। গ্রামের মেলায় যাত্রার দৃশ্য, কৃষক, ঘাটে বাঁধা নৌকা এমন মোট ৮টি কাজ আছে তাঁর। নিখুঁত, পরিপাটি পরিশীলিত। এটাই তাঁর কাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কাব্যিক দ্যোতনায় দর্শকদের হৃদয় আপ্লুত করে তোলে তাঁর শিল্পকর্ম।

মোহাম্মদ কিবরিয়ার কাজগুলো লিথোগ্রাফে। জাপানের উচ্চতর প্রশিক্ষণকালে তিনি যে নতুন শিল্পশৈলী আত্মস্থ করেছিলেন, তার নমুনা এই কাজগুলো। আকারে বেশ বড়। রেখা, বুনট ও পরিসরের বিন্যাসে অনন্য শিল্পভাষ্য রচিত হয়েছে এসব কাজে। শিল্পকর্ম রয়েছে ৯টি। এগুলো তাঁর পঞ্চাশ দশকের কাজ। প্রধানত সাদা-কালোতে করা।

রফিকুন নবীর কাজগুলো রঙিন। অনেক বড় আকার। তিনিই দেশে প্রথম বড় আকারের রঙিন ছাপচিত্রকলা চর্চার অন্যতম শিল্পী। গ্রিস থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এ বিষয়ে। রফিকুন নবী এঁকেছেন প্রধানত বাস্তব রীতিতে। মাছ, কাঠের সাঁকো, মাছরাঙা পাখি, জানালার ওপর বসা পায়রা এসবই তাঁর বিষয়। রঙে রেখায় আর কাঠের নিজস্ব বুনটের সংমিশ্রণে তাঁর ছাপচিত্রগুলো এক বিশেষ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ রয়েছে ১০টি।

মনিরুল ইসলাম দীর্ঘকাল স্পেনপ্রবাসী। সেখানেই উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি তাঁর এচিংয়ের কাজগুলোতে জলরঙের আবহ সৃষ্টি করে একটি নিজস্ব শিল্পভাষা তৈরি করেছেন। মূলত তাঁর কাজ বিমূর্ত রীতির। তবে অনেক সময় কিছু কিছু গভীর ইঙ্গিতময় প্রতীক, অবয়ব, শব্দ বা পঙ্‌ক্তির ব্যবহার করেন তিনি। তাঁর কাজে আছে রঙের স্নিগ্ধ প্রয়োগ। প্রদর্শনীতে সাদাকালোতে করা মিনিয়েচার ধাঁচের ৫টি কাজসহ মোট শিল্পকর্ম রয়েছে ১৩টি।

কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলা

কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলা চলছে তৃতীয় তলায়। এবার মেলায় অংশ নিয়েছে ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের আয়না’স অ্যটেলিয়ার, ইউডার প্রিন্টমেকিং স্টুডিও, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, সফিউদ্দীন প্রিন্ট মেকিং স্টুডিও, কসমস অ্যাটেলিয়ার ’৭১, কারখানা আর্ট স্পেস, মজুমদারস প্রিন্ট ল্যান্ড, কালনী আর্ট স্পেস ও কলাকেন্দ্রের কিবরিয়া প্রিন্ট মেকিং স্টুডিও। এই ১৫টি প্রতিষ্ঠানের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও নবীন শিল্পীরা তাদের কাজ নিয়ে এসেছেন ছাপচিত্র মেলায়। মেলা চলবে ৯ মে পর্যন্ত। আর নিচতলায় কিবরিয়া প্রিন্টমেকিং স্টুডিওতে চলছে ছাপচিত্রের কর্মশালা।

ছাপচিত্র উৎসবের কার্যক্রম প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলছে। সুলভে ছাপচিত্র সংগ্রহ আর পথিকৃৎ শিল্পীদের শিল্পকর্ম দেখতে আগ্রহীরা অংশ নিতে পারেন এই বর্ণাঢ্য উৎসবে।