
বিদায় বেলায় আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম সংবিধানের প্রতি, আইনের প্রতি এবং নিজের বিবেকের প্রতি একজন বিচারকের আনুগত্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়। তাঁর আনুগত্য সংবিধানের প্রতি, আইনের প্রতি এবং নিজের বিবেকের প্রতি।
বিচার বিভাগের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, সেসবের প্রসঙ্গেও আশফাকুল ইসলাম কথা বলেন। এই বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের বিচার বিভাগের সামনে আগামী দিনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। মামলার জট কমাতে হবে। বিচারকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বিচার বিভাগকে আরও দক্ষ, আরও আধুনিক এবং আরও সেবামুখী হতে হবে।’
আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচারকক্ষে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) আজ মঙ্গলবার নিজের বিদায়ী সংবর্ধনায় বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম এসব কথা বলেন। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও আপিল বিভাগের অপর বিচারপতিরা এ সময় বেঞ্চে ছিলেন।
১৯৫৯ সালের ১৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করা আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ এই বিচারপতির ৬৭ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। এ হিসাবে আজ তাঁর শেষ কর্মদিবস। এর মধ্য দিয়ে এই বিচারপতির দুই দশকের বেশি সময়ের বিচারিক জীবনের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। প্রথা অনুসারে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এই বিচারপতিকে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হয়। সংবর্ধনায় প্রথমে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বিদায়ী বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের কর্মময় জীবন নিয়ে বক্তব্য দেন।
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন যথার্থই বলেছিলেন, বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়; তার শক্তি নিহিত তার বিচারবোধ, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়। এটি আমাদের স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। বিচার বিভাগের দায়িত্ব সেই অঙ্গীকারকে সমুন্নত রাখা।’
বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই যথেষ্ট নয়; মানুষকেও তা দেখতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে বিচার হয়েছে—উল্লেখ করে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। সেই আস্থা রক্ষা করাই আমাদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব।
বিদায়ী ভাষণে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি একটি কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। বিচার বিভাগ শুধু বিচারকদের নয়, শুধু আইনজীবীদেরও নয়, এই বিচার বিভাগ আমাদের সবার। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী—আমরা সবাই এই প্রতিষ্ঠানের অংশ। আমরা যদি সবাই বিচার বিভাগকে নিজের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করি, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। বিচার বিভাগের শক্তি একা কোনো বিচারকের শক্তি নয়, একা কোনো আইনজীবীরও নয়। এটি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। তাই ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে কাজ করবে—এই প্রত্যাশা করি।’
২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম। ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। দুই বছর পর ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে স্থায়ী হন।