দেশে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা বাড়ছে। পরিকল্পিত পরিবার গঠনের প্রধান উপকরণগুলোর ব্যবহার ও সরবরাহ কমে এসেছে। আবার জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হারও কমছে। এদিকে দেশে বাড়ছে মোট প্রজননহার (টিএফআর)।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মোট প্রজননহার (টিএফআর) কমিয়ে আনার মাধ্যমে উন্নয়নের একটি মডেল তৈরি করেছিল। কিন্তু এ দেশে প্রজননহার এখন দীর্ঘ সময় ধরে কমছে না, বরং কিছুটা বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ আছে।
অপূর্ণ চাহিদা
বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (এসভিআরএস) ২০২৩ অনুযায়ী, আধুনিক পদ্ধতিতে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা বলতে সন্তান ধারণে সক্ষম (১৫-৪৯ বছর বয়সী) এবং বর্তমানে বিবাহিত এমন নারীদের একটি অংশকে বোঝায়, যাঁরা এ মুহূর্তে গর্ভধারণে আগ্রহী নন (সেটা হতে পারে পরবর্তী সন্তান ধারণপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে অথবা আর কোনো সন্তান না নিতে চাওয়ার কারণে)। অথচ কোনো প্রকার আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিও অবলম্বন করছেন না। এ সূচককে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতির চাহিদা হিসেবেও উল্লেখ করা যায়। পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদাকে প্রজননক্ষম নারীদের পরিবার পরিকল্পনার ইচ্ছা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্যকে নির্দেশ করে।
এসভিআরএস অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিবাহিত প্রজননক্ষম নারীর মধ্যে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ নারীর জন্মনিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ নারীর জন্মনিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে পরবর্তী সন্তান ধারণপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে এবং ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ নারীর জন্মনিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে আর কোনো সন্তান না নিতে চাওয়ার ক্ষেত্রে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালের তুলনায় অপূর্ণ চাহিদা সামান্য বেড়েছে। এ বৃদ্ধি মূলত আর কোনো সন্তান না নেওয়ার কারণে।
জন্মনিয়ন্ত্রণের অপূর্ণ চাহিদার হার সবচেয়ে বেশি রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে (৩১.৮৫%)। এর মধ্যে ২২.৩১ শতাংশ নারীর অপূর্ণ চাহিদা সন্তান ধারণপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার ক্ষেত্রে এবং ৯.৫৪ শতাংশ নারীর অপূর্ণ চাহিদা আর কোনো সন্তান না নেওয়ার ক্ষেত্রে। এদিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিলেট বিভাগ (৩১.৪৯%)। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ (২৭.৬৩%)। বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে এ হার যথাক্রমে ২২.৮৫ শতাংশ, ২৫.৭২ শতাংশ, ২০.৮৮ শতাংশ ও ১৯.৭৭ শতাংশ। অপর দিকে জন্মনিয়ন্ত্রণের অপূর্ণ চাহিদার হার সবচেয়ে কম ময়মনসিংহ বিভাগে (১৯.৬৩%)। এ বিভাগে ১১.৫৯ শতাংশ নারীর অপূর্ণ চাহিদা সন্তান ধারণপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার জন্য এবং ৮.০৪ শতাংশ নারীর অপূর্ণ চাহিদা আর কোনো সন্তান ধারণ না করার জন্য বিভাগভেদে পরিবার পরিকল্পনায় অপূর্ণ চাহিদার হারে প্রবণতা ২০২২ সালেও একই রকম দেখা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ইতিমধ্যে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা এখন পূর্বের তুলনায় বেড়ে গেছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহারের চিত্র কেমন
এসভিআরএস (২০২৩) অনুযায়ী, বর্তমানে সামগ্রিকভাবে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৬২.১ শতাংশ যেকোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহার করছেন। শহরাঞ্চলে বসবাসকারী নারীরা (৬৩.৯%) পল্লি এলাকায় বসবাসকারী নারীদের (৬১.৬%) তুলনায় জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি গ্রহণ করেছে বেশি। প্রশাসনিক বিভাগভেদে রংপুর বিভাগের নারীদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি (৬৮.১%)। আর সবচেয়ে কম জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে খুলনা বিভাগের নারীদের মধ্যে (৫৭.৯%)।
দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহারের হার কমে আট বছর আগের অবস্থায় চলে গেছে। ২০২৩ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহারের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ১ শতাংশে। ২০১৫ সালের পর এই হার সর্বনিম্ন।
স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ১০ বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৬২ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৫ সালে এ হার সামান্য কমে দাঁড়ায় ৬২ দশমিক ১ শতাংশে। এরপর ২০২৩ সালের আগপর্যন্ত এ হার এর নিচে নামেনি।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার কমলে গর্ভপাত ও গর্ভপাতের কারণে মৃত্যু বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ২০১৬ সালে গর্ভপাতে মৃত্যু ৬ শতাংশ ছিল, যা এখন বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে।
প্রজননহার বাড়ছে কেন
দেশে মোট প্রজননহার এখন ২ দশমিক ৪। বাংলাদেশ জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০২২–এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত ২২ বছরে মোট প্রজননহার (টিএফআর) ৩.৩ থেকে কমে ২.৩ হয়েছে। তবে ২০১১ সালের পর থেকে এই টিএফআর প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
জনসংখ্যাবিশেষজ্ঞ ওবায়দুর রব প্রথম আলোকে বলেন, দেশের মোট প্রজননহার কমছে না। বরং কিছুটা বেড়েছে বলা হচ্ছে। এখন যদি এটি ২ দশমিক ৪ হয়, সেটা খুব বেশি বৃদ্ধি নয়, তবে কিছুটা তো বৃদ্ধি বটেই। আর সার্বিকভাবে বলা যায়, জনসংখ্যা কার্যক্রমে একটা ধীরগতি রয়েছে। একে বাড়াতে হবে।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী বিতরণের চিত্র
দেশে অনেক দিন থেকেই জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে। ২০১৮ সালে দেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ছিল তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। সে বছর সারা দেশে বিতরণ করা হয়েছিল প্রায় ৮ কোটি ২৭ লাখ ওরাল পিল, প্রায় ৯ কোটি ৫১ লাখ কনডম এবং ১ কোটি ১২ লাখের বেশি ইনজেকটেবল জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি। শুধু ঢাকা বিভাগেই ওরাল পিল বিতরণ হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ও কনডম প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি, যা দেশের মোট সরবরাহের বড় অংশ। একই বছর স্থায়ী পদ্ধতিতেও (পুরুষ ও নারী নির্বীজন) মোট সংখ্যা ছিল ৯০ হাজারের বেশি, যা পরিবার পরিকল্পনার প্রতি জনগণের একটি সক্রিয় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু দুই বছর পর ২০২০ সালে এসে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। যদিও কিছু পদ্ধতিতে সংখ্যাগত দিক থেকে সামান্য ওঠানামা ছিল, সামগ্রিকভাবে সরবরাহের ধারাবাহিকতা দুর্বল হতে শুরু করে। ২০২০ সালে ওরাল পিল নেমে আসে প্রায় ৬ কোটি ৮৩ লাখে এবং ইনজেকটেবল কমে দাঁড়ায় প্রায় ৯৩ লাখে। স্থায়ী পদ্ধতির ক্ষেত্রেও হ্রাস স্পষ্ট—মোট সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৬৭ হাজারে। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কোভিড-১৯ মহামারির চাপ এ সময় বড় ভূমিকা রাখে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের চলাচল সীমিত হওয়া, সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন এবং মানুষের স্বাস্থ্যকেন্দ্রবিমুখতা পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে কার্যত স্থবির করে তোলে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে ২০২৫ সালের তথ্য থেকে। এ বছর সারা দেশে ওরাল পিল বিতরণ নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কম। কনডম বিতরণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৫৩ লাখে। যেখানে সাত বছর আগে ছিল ৯ কোটির বেশি। ইনজেকটেবল পদ্ধতিও নেমে এসেছে মাত্র ৫৯ লাখের ঘরে। স্থায়ী পদ্ধতির মোট সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজারে—২০১৮ সালের অর্ধেকের কম।
দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি নেওয়ার প্রবেশগম্যতা ও সরবরাহ, বিতরণ—তিন ক্ষেত্রেই সমস্যা রয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক মোহম্মদ মঈনুল ইসলাম। তিনি বলেন, জন্মনিরোধসামগ্রীর চাহিদা যে কমে গেছে, তা বলা যাবে না। কিন্তু সামগ্রী যদি হাতের কাছে না পায়, তাহলে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, দুর্গম এলাকায় এ সমস্যা বেশি হয়।