সারের ভর্তুকি বর্তমানে দেশের কৃষি সহায়তার সবচেয়ে বড় উপাদান। এটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। এই ভর্তুকি কৃষকদের উৎপাদন ও মূল্যস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। তবে ভর্তুকিতে কেনা সারের পরিমাণের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বেশি জমির মালিক কৃষকেরা বেশি সুবিধা পান। দেশের শীর্ষ ২০ শতাংশ জমির মালিক মোট সারের ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক সুবিধা ভোগ করেন, অথচ নিচের ৪০ শতাংশ কৃষক পান মাত্র ১৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের কৃষি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের করা এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীতে আজ সোমবার বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে এক অনুষ্ঠানে ‘রিপারপোজিং অ্যাগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশ’স অ্যাগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্যব্যবস্থায় মানসম্মত প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কৃষি খাতকে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ করে। তবে কৃষি প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার দুর্বল হয়েছে এবং উচ্চ মূল্যের কৃষিপণ্যে বৈচিত্র্য আনার অগ্রগতি পিছিয়ে রয়েছে। এদিকে ভোক্তাদের চাহিদা ক্রমেই ফল, সবজি, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে।
সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ ভর্তুকি ও ধানকেন্দ্রিক সহায়তায় ব্যয় হলেও কৃষি উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, সম্প্রসারণ ও পরামর্শসেবা, সেচ, বাজারসংযোগ এবং জলবায়ু–সহনশীলতা বৃদ্ধির মতো খাতগুলো তুলনামূলকভাবে কম অর্থায়ন পাচ্ছে।
সারের ব্যবহারেও বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার মধ্যে সুষম পুষ্টি উপাদানের সার ব্যবহার করেন। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করা গেলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটি বড় সুযোগ।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, সীমিত আর্থিক সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সারের মূল্য ও সরবরাহে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা কৃষিনীতি ও ব্যয়ের দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। সুখবর হলো, সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুস্পষ্ট পথ রয়েছে। সহায়তা প্রদানের পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং ধীরে ধীরে কৃষি ব্যয়কে অধিক ফলদায়ক বিনিয়োগের দিকে পুনর্বিন্যাস করতে পারলে বাংলাদেশ আরও সহনশীল ও উৎপাদনশীল কৃষি-খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা অধিক এবং ভালো মজুরির কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারি ব্যয় ধান উৎপাদনের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে রয়েছে, যা কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশের মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয় এবং কৃষি ভর্তুকির প্রায় ৮০ শতাংশ সুবিধা এ খাতেই যায়। অথচ প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, সবজি এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মতো উচ্চ মূল্যের উপখাতগুলো আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও বেশি সম্ভাবনাময়।
প্রতিবেদনে ধাপে ধাপে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। স্বল্প মেয়াদে মাটির পরীক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষক পরামর্শসেবা জোরদার এবং ফার্মারস কার্ড ও ই-ভাউচার চালুর মাধ্যমে কৃষি ব্যয়কে দরিদ্র ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে সহায়তা প্রদানের পদ্ধতি উন্নত হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যের কৃষিতে সহায়তা এবং দরিদ্র কৃষকদের উপকারে আসবে—এমন বিনিয়োগে আরও বেশি সম্পদ বরাদ্দ করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনের সহলেখক মনসুর আহমেদ বলেন, সারের ভর্তুকির নকশা ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়ন করলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং প্রকৃত প্রয়োজন থাকা কৃষকদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে।