টরকীতে বিক্রি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বরিশালের পান
টরকীতে বিক্রি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বরিশালের পান

সবুজ পাতায় কোটি টাকার স্বপ্ন

‘পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম, বন্ধু ভাগ্য হইল না...’ আবহমান বাংলার লোকগান, আড্ডা কিংবা সংস্কৃতিতে পান কেবল একটি চিবানোর পাতা নয়; এটি বাঙালির আতিথেয়তা, প্রেম, আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতে যাকে বলা হতো ‘তাম্বূল’, সেই পান একসময় ভারতবর্ষের নবাব আর জমিদারদের বৈঠকখানায় ছিল প্রধান আকর্ষণ। সময়ের বিবর্তনে আভিজাত্যের সেই জৌলুশ হয়তো বদলেছে, কিন্তু কমেনি এর কদর।

বরং আধুনিক যুগেও ‘আগুন পান’ কিংবা ‘বরফ পানের’ জাদুতে মজে আছে তরুণ প্রজন্ম। আর এই পানের ঐতিহ্যের অন্যতম এক প্রাণকেন্দ্র হয়ে আজও টিকে আছে বরিশালের গৌরনদীর শতবর্ষী ‘টরকী বন্দর পানের হাট’। এই হাট দেখলে বোঝা যায়, একটি পাতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় কোটি টাকার অর্থনীতি।

পানের আভিজাত্য: নবাবি জৌলুশ থেকে আধুনিক ধারা

ভারতবর্ষে পানের ইতিহাস বহু পুরোনো। আয়ুর্বেদশাস্ত্র থেকে শুরু করে মোগল দরবার—সবখানেই পানের জয়জয়কার। রুপা বা পিতলের কারুকার্যখচিত পানদান একসময় বনেদি পরিবারের আভিজাত্যের পরিচয় ছিল। পানের গুরুত্ব বাঙালি সমাজে এতটাই গভীরে যে সামান্য ভুলকে আমরা আজও বলি—‘পান থেকে চুন খসা’। সময়ের বিবর্তনে পানের ব্যবহারে পরিবর্তন এসেছে। তবে বাহারি আঙ্গিকে নানা উপকরণ বা উপাদানের মিশেলে মজাদার ও মুখরোচক পান যেন এখনো সবার কাছে দারুণ জনপ্রিয়। অন্যদিকে গ্রামীণ জনপদে প্রবীণদের কাছে পান-সুপারি আজও ক্লান্তি ভোলার প্রধান অনুষঙ্গ।

সংস্কৃতে যাকে বলা হতো ‘তাম্বূল’, সেই পান একসময় ভারতবর্ষের নবাব আর জমিদারদের বৈঠকখানায় ছিল প্রধান আকর্ষণ। সময়ের বিবর্তনে আভিজাত্যের সেই জৌলুশ হয়তো বদলেছে, কিন্তু কমেনি এর কদর।

নদীর তীর থেকে মহাসড়কের কোলে

টরকী বন্দরের প্রাণ ছিল একসময় টরকী লঞ্চঘাট। সেই ঘাটের ১৫ কদম দূরেই যেখানে আজকের কাঠপট্টি, সেখানেই একসময় বসত জমজমাট পানের আড়ত। নদীপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নৌকায় করে মানুষ আসত পান কেনাবেচা করতে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমা ও অবহেলায় নদী মরে গেছে, নাব্যতা হারিয়েছে লঞ্চঘাট। তবে পানের চাহিদা ফুরায়নি। তাই সময়ের প্রয়োজনে আর উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধার্থে পানের আড়তগুলো ধীরে ধীরে সরে এসেছে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের কোল ঘেঁষে।

বর্তমানে গৌরনদী পৌর এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ডের টরকী বাসস্ট্যান্ড–সংলগ্ন নীলখোলা এলাকায় এই হাটের অবস্থান। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ও এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বাজারে এখন প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ চলে।

পানের গণিত ও কোটি টাকার বাণিজ্য

টরকী বাজারে সপ্তাহের পাঁচ দিন (বৃহস্পতিবার ও সোমবার ছাড়া) চলে এই বিশাল বাণিজ্য। চারটি থানার মানুষের জীবন-জীবিকা এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আড়তদারদের দেওয়া তথ্যমতে, বার্ষিক গড়ে এখানে ২৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। মহাসড়কের দুই পাশে সারি সারি ১৩টি বড় আড়ত—গাউছিয়া, মোহাম্মাদী, সোনার মদিনা, এলাহী, শাহজালাল—সব জায়গাতেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে হাঁকডাক। মৌসুমে প্রতিটি আড়তে ২০–২৫ জন শ্রমিক পানের মান যাচাই ও গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন। পানের বাজারের হিসাব ও ভাষা সাধারণের কাছে কিছুটা গোলমেলে মনে হতে পারে। শত বছরের পুরোনো এই বাণিজ্যিক রীতি আজও টিকে আছে ‘গন্ডা’, ‘পণ’ আর ‘বিড়া’র হিসাবে: ১ গন্ডা ৪টি পান, ১ পণ (বা কুড়ি) ২০ গন্ডা বা ৮০টি পান, ১ বিড়া ৭২ থেকে ১০০টি পানের সমন্বয় (হিসাবভেদে ভিন্ন হয়)।

আড়তদার কাজী মিজান জানান, বর্তমানে পানের দাম বেশ চড়া। এক বিড়া ভালো মানের পান এখন ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানের পান বিক্রি হয় ১০ থেকে ৩০ টাকায়। তবে ভরা মৌসুমে (আষাঢ়-শ্রাবণ) এই দাম নেমে আসে ৭০-১০০ টাকায়। তখন প্রতিদিন গড়ে ১০ ট্রাক পান এই বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়।

আবু বকর ঘরামির মতো অনেক ব্যবসায়ী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা ছেড়ে নিজ এলাকা টরকীতে সম্ভাবনাময় পান ব্যবসায় ফিরে এসেছেন। আগে পানের বড় আড়ত পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে আড়তদারি করতেন তিনি। এই আড়তে আসা পান বেশির ভাগই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের।

যেখানে সচল অর্থনীতি

পানবরজ তৈরির জন্য প্রয়োজন বিশেষ যত্ন ও উপকরণ। টরকীর আড়তগুলোর পাশেই গড়ে উঠেছে পাটখড়ি, শণের সুতা, বাঁশ আর খড়ের এক বিশাল বাজার। এ বাজারে বরজের ব্যবহার উপযোগী কৃষি উপকরণ বিক্রি করেন ব্যবসায়ী সোহাগ ঘরামি। তিনি জানান, পানের বরজ তৈরিতে পাটকাঠির কোনো বিকল্প নেই। মান ও আকারভেদে বাজারে পাটকাঠির দামে রয়েছে ভিন্নতা। সোহাগ ঘরামির জানান, ‘পাটখড়ি তিন রকম দামে বিক্রি হচ্ছে। যেটা লম্বা ও শক্ত—সেটা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায় (১০০ মুঠো বা আঁটি), মাঝারি আঁটি ১ হাজার ২০০ টাকা, আর যেগুলো নরম ও খাটো আঁটি সেগুলো বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়।’ মূল পানের ব্যবসার পাশাপাশি এই সহযোগী উপকরণগুলোর ব্যবসা এই এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।

চাষি ও আড়তদারদের জীবন

এই পানের হাট শুধু একটি বাজার নয়, পানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবনের গল্প। আড়তদার মনির খান শোনালেন তাঁর উঠে আসার গল্প। একসময় নিজেই পান চাষ করতেন, বিক্রি করতেন হাটে। এরপর দেখলেন এ অঞ্চলে প্রচুর পানের ক্রেতা আসছেন, বন্দরে একটি আড়ত দিলে ব্যবসা ভালো জমবে। এই ভাবনা থেকেই কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন নতুন একটি আড়ত। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের জীবন এমনই। পানের জগতেই আমাদের ঘরবসতি।’

আবু বকর ঘরামির মতো অনেক ব্যবসায়ী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা ছেড়ে নিজ এলাকা টরকীতে সম্ভাবনাময় পান ব্যবসায় ফিরে এসেছেন। আগে পানের বড় আড়ত পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে আড়তদারি করতেন তিনি। এই আড়তে আসা পান বেশির ভাগই দেশের দক্ষিণাঞ্চলের।

টরকী থেকে পান কিনে দেশের নানা প্রান্তের আড়তগুলোয় সরবরাহ করেন বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁদের একজন সিয়াম তালুকদার। তবে তিনি একা নন, তাঁর বাবার সঙ্গে মিলে দিনে কয়েক হাজার বিড়া পান কেনেন। এখানে কেনাবেচা হয় মূলত ‘ডাকে’ বা নিলামে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, লেনদেন হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নগদ টাকায়। এর ফলে চাষিরা তাঁদের পরিশ্রমের ফসলের মূল্য সহজে নিতে পারেন।

বিদেশে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার কারণেই বাজার অস্থিতিশীল হয়। রপ্তানি চালু থাকলে চাষি ও পাইকার—সবাই লাভের মুখ দেখত।
আড়তদার হাজি রিয়াজুল ইসলাম
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দরের নীলখোলা এলাকায় পানের আড়তে চলছে বেচাকেনা। গত শনিবার

স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপ

বাইরে থেকে বাজারটি জমজমাট মনে হলেও এর ভেতর রয়েছে গভীর দীর্ঘশ্বাস। আড়তদার মাসুম শাহ এবং কাজী তৌফিক ইকবাল সজল জানালেন নেপথ্যের সেই গল্প। তাঁদের বড় আক্ষেপ—পান একটি কৃষিপণ্য হওয়া সত্ত্বেও চাষিরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। পান চাষে সারের ভর্তুকি নেই, নেই সহজ শর্তে কোনো ব্যাংকঋণ।

পচনশীল পণ্য হওয়ায় গরমের দিনে পান ‘জ্বইলা’ বা পুড়ে যায়, আবার খেত থেকে তুলে আনা পান সংরক্ষণাগারের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া বাজারে কোনো সর্বনিম্ন মূল্য নেই। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে রপ্তানি বন্ধ হওয়ায়। আড়তদার হাজি রিয়াজুল ইসলাম আক্ষেপ করেন, ‘বিদেশে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার কারণেই বাজার অস্থিতিশীল হয়। রপ্তানি চালু থাকলে চাষি ও পাইকার—সবাই লাভের মুখ দেখত।’

বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি পান রপ্তানি করা হয়। এর বাইরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পান রপ্তানি করা হয়। তবে যুক্তরাজ্যে পান রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশে উৎপাদিত পানে ক্ষতিকর সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়ার কারণে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ থেকে সাময়িকভাবে পান রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কয়েক দফায় নিষেধাজ্ঞা ২০২০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত হয়। এরপর ইইউ পান রপ্তানিতে কতিপয় শর্ত জুড়ে দেয়—পান সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ামুক্ত হতে হবে, উৎপাদন থেকে জাহাজীকরণ পর্যন্ত উত্তম কৃষি চর্চা (জিএপি), গুড হাইজিন প্র্যাকটিসেস (জিএইচপি), গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসেস (জিএমপি) অনুসরণ করত হবে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অ্যাক্রিডিটেড ল্যাব থেকে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ামুক্ত সনদ দিতে হবে। এসব শর্তের পর থেকে এখন সীমিত পরিসরে রপ্তানি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, পান রপ্তানি আটকে যাচ্ছে যথাযথ পরীক্ষাব্যবস্থার অভাবে। পচনশীল এই পণ্য তাৎক্ষণিক পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। শুধু বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। তবে বেশ ব্যয়বহুল এবং সময়ও বেশি লাগে।

মোহাম্মদ মনসুর জানান, পান প্যাকেজিংয়ের একমাত্র কেন্দ্র রাজধানীর শ্যামপুরে কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউস। এখানে স্থাপিত উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ ল্যাবরেটরিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে রূপান্তরের প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে পর্যাপ্ত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যে পান রপ্তানি বন্ধ আছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তা চালু হলেও যথাযথ পরীক্ষাব্যবস্থার অভাবে সীমিত আকারে রপ্তানি হচ্ছে। কেবল মধ্যপ্রাচ্যে পান রপ্তানি স্বাভাবিক আছে। ইইউ ও যুক্তরাজ্যে আগে প্রতি কেজি ৭ থেকে ১০ ডলারে পান রপ্তানি করা হতো। বর্তমানে এই বাজারে মালয়েশিয়া ও ভারতের পান যাচ্ছে।

আগামীর স্বপ্ন

এত সংকট আর সীমাবদ্ধতার মধ্যেও টরকীর মানুষ স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। রুবেল গাজী ও সোহাগ গাজীর মতো তরুণ ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে তাঁদের দাবিদাওয়া পেশ করেছেন। মিলেছে আশ্বাসও—শিগগিরই পান রপ্তানির বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

টরকী হাটের মানুষেরা চান তাঁদের উৎপাদিত ‘সবুজ পাতা’ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আবার বিদেশের মাটিতে স্বাদ ছড়াক। তবেই হয়তো পুরোনো লঞ্চঘাটের সেই হারিয়ে যাওয়া জৌলুশ মহাসড়কের এই ধমনিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে।

টরকীর পানের হাট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য আর কৃষি যদি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে তা কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।