
রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় কতক্ষণ পড়ে ছিলেন মনে নেই মো. সফিকুল ইসলামের (৪৩)। তাঁর ধারণা, এক-দেড় ঘণ্টা! কারণ তখন বিকেলের আলো ফিকে হয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছিল। গোলাগুলি, হইচই থেমে গিয়েছিল। যুদ্ধাবস্থা শেষে যেন কিছুটা নীরবতা। এর মাঝে একজন অটোরিকশাচালক এসে তাঁকে রাস্তা থেকে টেনে তুলে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আন্দোলনরত অবস্থায় আবু সাঈদ রংপুরে যেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হন, সেই একই দিনে গাজীপুরে গুলিবিদ্ধ হন উত্তরবঙ্গের সফিকুল ইসলাম।
সফিকুল ইসলাম (৪৩) পিকআপচালক ছিলেন। বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি পৌরসভার ধাপ গ্রামে। উত্তরবঙ্গ থেকে মালামাল আনা–নেওয়া করতেন পিকআপে করে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। দিনের পর দিন অসহ্য যন্ত্রণা ভোগের মধ্যে চিকিৎসকেরা দেন সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদটি! গুলিবিদ্ধ ডান পা কেটে বাদ দিতে হবে। দেড় বছর হয়ে গেল জীবন চলছে এক পা ছাড়া। পিকআপ চালিয়ে আয়ের পথ বন্ধ। অপর দিকে পা কেটে ফেলার তিন মাস আগে সরকারি তালিকাভুক্ত হওয়ায় ‘অতি গুরুতর আহত’ শ্রেণিভুক্ত হননি। ফলে যা পাওয়া উচিত সে তুলনায় মাসে ৫ হাজার টাকা কম ভাতা পাচ্ছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকেও তিনি কোনো অর্থসহায়তা পাননি বলে দাবি করেন।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই শহীদ’ ও আহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ৮৬৫ জন। তালিকাভুক্ত আহত যোদ্ধা ১৫ হাজার ৯০৩।
আহতের ধরন অনুসারে তালিকাভুক্ত করে ভাতা দিচ্ছে সরকার। অতি গুরুতর আহতদের ‘ক’ শ্রেণি, গুরুতর আহতদের ‘খ’ শ্রেণি ও সাধারণ আহতদের ‘গ’ শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহতের ধরনের মধ্যে রয়েছে, ন্যূনতম এক চোখ বা হাত বা পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অনুপযোগী, সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন, সম্পূর্ণরূপে মানসিক বিকারগ্রস্ত, অঙ্গহানি, গুরুতর আহত হয়ে দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতে অক্ষম। এই তালিকায় থাকা আহত ব্যক্তিরা মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। খ শ্রেণিভুক্তদের আহতের ধরনের বিবরণে বলা হয়েছে, ‘আংশিক দৃষ্টিহীন, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা অনুরূপ আহত ব্যক্তি’। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যাঁদের শ্রবণশক্তি বা দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গুলিতে আহত বা অনুরূপভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে সক্ষম হয়েছেন—তাঁদের ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। ‘খ’ শ্রেণিভুক্তরা ১৫ হাজার টাকা ও ‘গ’ শ্রেণিভুক্তরা মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। সফিকুল ইসলাম ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত হিসেবে মাসে ভাতা পান ১৫ হাজার টাকা।
সংসার চালাতে হিমশিম
সফিকুল ইসলাম বাবা-মা হারিয়েছেন অনেকে আগেই। ৮ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। স্ত্রী রেশমা বেগম ও দুই মেয়ে নিয়ে সংসার। বড় মেয়ে সুস্মিতা ইসলাম (২১) স্থানীয় একটি কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষ ও ছোট মেয়ে মারিয়াম সুলতানা (১৪) অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।
সফিকুল বলেন, ‘আমরা (স্বামী-স্ত্রী) দুইজন লেখাপড়া না জানলেও মেয়েদের পড়াশোনা করাই। বুঝতেই পারতেছেন, দুইটা মেয়ে পড়ালেখা করতেছে, ওদের পেছনে খরচ আছে। সংসারের খরচ আছে। পা কাটা পড়ায় কোনো কাজ করতে পারি না। ইনকাম (আয়) বন্ধ হয়ে গেছে।’ তিনি জানান, আগে পিকআপে একেক ট্রিপে আড়াই হাজার করে নিতেন। মাসে এমন ১০-১২টা ট্রিপ থাকত তাঁর।
পা হারানোর ঘটনা বলতে গিয়ে সফিকুল জানান, তিনি ১৬ জুলাই বিকেলে গুলিবিদ্ধ হন। সেদিন পিকআপ চালিয়ে রংপুর থেকে মুরগি পুরান ঢাকার কাপ্তানবাজারে সরবরাহ করে ফিরছিলেন। ফেরার পথে গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি একাডেমির পূর্ব পাশে থামেন। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে পান খাওয়ার জন্য একটি দোকানের সামনে দাঁড়াতেই গুলিবিদ্ধ হন। তখন ৪টার মতো বাজে। সফিকুল বলেন, রাস্তায় পড়ে যাওয়ার পর ডান হাত ভেঙে যায়, তীব্র ব্যথা অনুভব করছিলেন। কিন্তু পায়ে গুলি লাগার বিষয়টি তিনি অনেক পরে টের পান। চারপাশে গোলাগুলি ছোটাছুটি চলছে। সাহায্যের জন্য তিনি চিৎকার করছিলেন। রক্তাক্ত অবস্থায় এক-দেড় ঘণ্টা রাস্তায় পড়ে থাকার পর একজন অটোরিকশাচালক তাঁকে রাস্তা থেকে গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান।
সফিকুল অভিযোগ করেন, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর খুব অবহেলার শিকার হন। ৬ দিন পর একজন চিকিৎসক এসে খুব দুর্ব্যবহার শুরু করেন। তিনি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) (পঙ্গু হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত) স্থানান্তর করতে বলেন। সেখানে সেবা পাচ্ছিলেন না। তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার (পরে নিষিদ্ধঘোষিত) পতনের পর রাতারাতি পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
সফিকুলের ভাষায়, ‘এরপর আমাদের মূল্যায়ন করা শুরু হলো। আমাদের খুঁজে খুঁজে বের করে চিকিৎসা দেওয়া শুরু হলো। এর আগে চিকিৎসার জন্য ২০-২২ দিন নিজের টাকা খরচ করতে হইছে। ঋণ করছিলাম ৯০ হাজার টাকা।’ তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার দেড় মাস পর তাঁর হাতে ও পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। দুই মাসের বেশি সময় হাসপাতালে থাকার পর তিনি বাড়ি ফিরে যান। এর কিছুদিন পর তাঁর ডান পায়ে সংক্রমণ দেখা যায়। বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর পা-টি রক্ষা পায়নি। বারবার পায়ে সংক্রমণ দেখা দিলে এক পর্যায়ে পায়ের ৬ ইঞ্চি হাড় কেটে ফেলা হয়। তাতেও সংক্রমণ ঠেকানো না গেলে গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। সফিকুল জানান, বগুড়া জেলায় তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি জুলাই আন্দোলনে পা হারিয়েছেন।
তাঁকে ব্র্যাক থেকে একটি আধুনিক কৃত্রিম পা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বা দূরে কোথাও গেলে কৃত্রিম পা ব্যবহার করেন। সব সময়ের জন্য ক্রাচ ব্যবহার করেন। ইনকিলাব মঞ্চ একটি অটোরিকশা সহায়তা দিয়েছিল। সেটি ভাড়া দিয়ে মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পান।
‘জুলাই ফাউন্ডেশনে ৫ বার গেছিলাম, টাকা পাই নাই’
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে আহত অনেকে অন্তত এক লাখ টাকা করে পেলেও সফিকুল ইসলাম কোনো অর্থ পাননি বলে অভিযোগ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘না হলেও ৫ বার গেছিলাম জুলাই ফাউন্ডেশনে। গেলে বলে, “আপনার আসতে হবে না। ফোন করে খোঁজ নিয়েন।” অনেকবার কল দিছি হটলাইন নম্বর ১৬০০০–এ। একবার বলছিল, “আমরাই বেতন পাচ্ছি না”। কয়েক দিন আগেও কল দিছিলাম।’
সফিকুল জানান, তাঁর পা কেটে বাদ দেওয়ার তিন মাস আগে আগে জুলাইয়ে আহত হিসেবে তালিকাভুক্ত (গেজেট নম্বর ৮৩০) হয়েছিলেন। ফলে তিনি ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত হিসেবে ১৫ হাজার টাকা ভাতা পান। তিনি ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করবেন। কারণ, তাঁর সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) কামাল আকবর প্রথম আলোকে বলেন, তহবিলে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় জুলাই শহীদ ও আহত প্রত্যেককে সম্পূর্ণ সহায়তা দেওয়া যায়নি। পাঁচ মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মীদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, জুলাই শহীদ ও আহতদের সহায়তায় ফাউন্ডেশনের প্রয়োজন ছিল ৩৮৩ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার ১০০ কোটি টাকা দিয়েছিল। মোট ৬ হাজার ৩০০ জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রত্যেককে সহায়তা দিতে ফাউন্ডেশনের আরও ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে কামাল আকবর বলেন, বর্তমান সরকার টাকা শিগগিরই দেবে বলে জানিয়েছে।