
হবিগঞ্জের রেমা–কালেঙ্গা বনে সারা দিন গবেষণাকাজ শেষে শরীরটা বেশ ক্লান্ত। শেষ বিকেলে সাতছড়ির বন অধিদপ্তরের বাংলোতে পৌঁছালাম। দিনটি ছিল গত অক্টোবর মাসের ২২ তারিখ। বাংলোর আশপাশের গাছগুলোতে সব সময়ই একদল বানরের আনাগোনা থাকে। কিন্তু সেদিন বিকেলটায় এই প্রাণীগুলোর দেখা পেলাম না।
রুমে ঢোকার আগেই দূর থেকে একদল হনুমানের ডাক শুনলাম। মনে হচ্ছিল তাদের মধ্যে খুব ঝগড়া হচ্ছে। খুব ভালো করে ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। কিন্তু বুঝতে বেশ খানিকটা দেরি হলো। পাঁচটি মুখপোড়া হনুমানের সঙ্গে একটি চশমাপরা হনুমানের সংঘাত। এ রকম কখনই দেখিনি। হনুমানের বিপন্ন এই দুটি প্রজাতি সব সময়ই আলাদা দলে থাকে। সাধারণত একসঙ্গে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় না। তাদের খাবার সংগ্রহের ধরন আর জীবনযাপনের অনেক অমিল রয়েছে। কিন্তু সেদিন তাদের আচরণে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মুখপোড়া হনুমানটির কোলে চমশাপরা হনুমানের একটি ছোট্ট বাচ্চারও দেখা পেলাম।
হনুমানের এই মিশ্র দল দেখে সঙ্গে থাকা সবাই অবাক হলেন। আধা ঘণ্টার মতো দলটির ঝগড়া চলল। তবুও মুখপোড়া হনুমানটির ওই বাচ্চাটি তার কোল থেকে কাউকে দিল না। এর কিছুক্ষণ পর হনুমানের দলটি কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
রুমে ফিরেই এ বনের হনুমান নিয়ে গবেষণা করেন, এমন দুজন সহকর্মীকে কল দিলাম। এর মধ্যে হাসান আল রাজী বললেন, তাঁরা হনুমানের যে সংকরায়ণ হচ্ছে, তার ইঙ্গিত পাচ্ছেন বেশ কিছুদিন ধরেই। তিনি সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছেন স্পিনজার জার্নালে। সাতছড়ির বাইরে রেমা-কালেঙ্গা ও লাঠিটিলা বনেও হনুমানদের ভেতরে এ ধরনের সংকরায়ণ হচ্ছে বলে তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন।
আরেক গবেষক তানভীর আহমেদ সৈকতও এই বনে বহুদিন ধরে গবেষণা করছেন হনুমান নিয়ে। তিনিও এ রকম ঘটনা স্বীকার করে বেশ কিছু গবেষণাধর্মী তথ্য পাঠালেন। তিনি বললেন, এ রকম ঘটনার ছবি তাঁর কাছে নেই। তবে গত বছরের জানুয়ারি মাসে রেমা–কালেঙ্গা বন থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অরিত্র সাত্তার একটি হাইব্রিড হনুমানের ছবি তুলেছেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক এই হনুমানটির চেহারায় দুটি হনুমান প্রজাতির সংমিশ্রণ দেখা যায়। এই হনুমানটির পিঠ, হাত, পা ও লেজের রং এবং চোখের বাইরের সাদা অংশ চশমাপরা হনুমানের মতো। আর মাথার কালো টুপির মতো চুল, মুখের কালো ত্বক এবং বুকের কমলা রং আবার মুখপোড়া হনুমানের মতো।
সাতছড়িতে হনুমানের এই দলের ছবি পাওয়া আমার কাছে একেবারেই সৌভাগ্যের মতো মনে হলো। এই ছবিটি আর পুরো ঘটনাটি আমার প্রত্যক্ষ দেখা অনেক প্রশ্নের সহজ সমাধান দেয়। আসলেই এই বনের দুই প্রজাতির হনুমানের মধ্যে সংকরায়ণ হচ্ছে। আর এর ফলে হাইব্রিড হনুমানের বাচ্চার অবস্থা কী হয়, তা আসলে গবেষণার বিষয়। হনুমানের এই সংকরায়ণের এ রকম আরও একটি তথ্য প্রায় দুই দশক আগে অধ্যাপক মফিজুল কবির তাঁর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সময় উল্লেখ করেছিলেন।
আমাদের হনুমানগুলোতে কেন এমন হচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু তথ্য পেলাম। বন ধ্বংসের কারণে এখন বড় বনগুলো খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়েছে। আর এই দুই প্রজাতির হনুমান কখনো মাটিতে নামে না। বসবাসের জন্য তাদের ভরসা বনের বড় বড় গাছই। বনের গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে হনুমানের দলগুলোও ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেছে। পুরুষ ও মেয়ে হনুমানের সংখ্যার তারতম্য দেখা দিয়েছে। এর ফলে হনুমানদের ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সংকরায়ণ শুরু হয়েছে।
হনুমানের এই সংকরায়ণ তাদের নিজেদের টিকে থাকার জন্য একেবারেই শুভ নয়। সব মিলিয়ে এই পৃথিবীতে মাত্র ২ হাজার ৫০০টি চশমাপরা হনুমান টিকে আছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের প্রাণীর লাল তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী এই প্রাণীটি বিপন্ন, আর এ দেশে মহাবিপন্ন। মুখপোড়া হনুমানের অবস্থাও প্রায় একই রকম। এরাও সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। এ রকম চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এই প্রাণীটি বন থেকেই হারিয়ে যেতে পারে।
শুধু আমাদের দেশেই নয়, অন্য দেশেও হনুমান প্রজাতির এ রকম সংমিশ্রণের কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভুটানে এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সোনালি হনুমানের প্রায় ১৫ ভাগই মুখপোড়া হনুমানের সঙ্গে সংকরায়ণের ফলে এই সোনালি হনুমানটি বিশ্বব্যাপী এখন মহাবিপন্ন তালিকায় স্থান পেয়েছে। আমাদের বনগুলোতে হনুমানদের সংকরায়ণ রোধে এখনই আরও গবেষণা আর উদ্যোগ প্রয়োজন।