
তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন লাইটক্যাসল পার্টনার্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিজন ইসলাম।
ক্যারিয়ারের পঞ্চম বছরে গিয়ে আমি প্রতিষ্ঠানটি শুরু করি। এর আগে সিটি ব্যাংকে করপোরেট কাজ করেছি। প্রতিষ্ঠান শুরু করার সময় আমার কাছে মনে হয়েছিল, একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই যাত্রায় কারা সঙ্গে থাকছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
লাইটক্যাসল পার্টনার্স শুরু করা প্রসঙ্গে কথাগুলো বলেন বিজন ইসলাম। পর্বটি প্রচারিত হয় গত শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, আইবিএ বা বড় বড় বিজনেস স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে অনেকেই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে গেলেও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বা ম্যানেজমেন্ট কনসালটিংয়ে কেন যেতে চান না?
উত্তরে বিজন ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বা কনসালটিং খাত এখনো ততটা বিকশিত হয়নি। আমার মতে, কনসালটিংয়ের চাহিদা সাধারণত বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আসে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো অনেক ব্যবসা প্রথম প্রজন্মের মালিক বা দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। ধীরে ধীরে এসব ব্যবসা পেশাদার ব্যবস্থাপনার দিকে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা ও কনসালটিংয়ের চাহিদাও বাড়বে।
এ প্রসঙ্গে বিজন ইসলাম আরও বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসার মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার এই পরিবর্তন এখনো চলমান। অন্যান্য অনেক বাজারে যে পরিবর্তন আরও আগে হয়েছে, বাংলাদেশে সেটি এখনো পুরোপুরি হয়নি। তাই গবেষণা ও কনসালটিং খাতের বিকাশের জন্য আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন।
লাইটক্যাসল পার্টনার্স প্রতিষ্ঠার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? সঞ্চালক জানতে চাইলে বিজন ইসলাম বলেন, ‘আইবিএর সহপাঠী জাহেদ, ইফজাত ও সাইফকে সঙ্গে নিয়ে লাইটক্যাসল শুরু করি। জাহেদ তখন এইচএসবিসি ব্যাংকে আর ইফজাত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডে কাজ করার পর একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন। সাইফও ছিলেন আমার ব্যাচমেট। চারজন মিলে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করি আমরা।’
বিজন ইসলাম আরও বলেন, ‘আইবিএর দিনেগুলোর মতো একদিন ইফজাতের বাসায় রাতে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। সারারাত আড্ডার পর সকালে ধানমন্ডি লেকে হাঁটতে হাঁটতেই প্রতিষ্ঠানটির আইডিয়াটি আসে। পরে একটি ডিনার আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের যাত্রা শুরু হয়।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, কোনো ব্যবসায়ী পরিবারের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষে সরাসরি পরিচালনা পর্ষদে না বসে কোথা থেকে কাজ শুরু করা উচিত?
উত্তরে বিজন ইসলাম বলেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠানে আমি দেখেছি দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের সদস্যরা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ থেকে কাজ শুরু করেন। আমার মতে, বাইরে থেকে এসে সরাসরি পরিচালক হওয়ার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পেশাদার ব্যবস্থাপনাও থাকা প্রয়োজন। এমনকি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মতো পদেও বাইরের পেশাদার কাউকে আনা যেতে পারে।’
এরপর লাইটক্যাসলের বড় করপোরেট পোর্টফোলিও সামলানোর চ্যালেঞ্জের কথা জানতে চান সঞ্চালক।
বিজন ইসলাম জানান, প্রতিষ্ঠানটি এখন আগের তুলনায় কম কাজ করে। একসময় বছরে ৪০ থেকে ৫০টি কাজ করলেও এখন তা কমিয়ে ২৫ থেকে ৩০টির মধ্যে রাখা হয়। এর বড় একটি অংশই পুনরাবৃত্ত ক্লায়েন্ট। গেটস ফাউন্ডেশন, মেটা, ডাচ দূতাবাস, সুইস দূতাবাস ও এইচঅ্যান্ডএম ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠান তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করছে।
লাইটক্যাসলের মতো প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রসঙ্গে বিজন ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে মেধাবীদের একটি অংশ উচ্চশিক্ষা বা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য দেশের বাইরে চলে যায়। এটিকে আমি ব্রেইন ড্রেইনের সঙ্গে যুক্ত করেছি। তবে আমার প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে বৈশ্বিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করছে এবং সিঙ্গাপুর ও ওয়াশিংটনে আমাদের অফিস রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশের কর্মী এখনো বাংলাদেশি এবং আমাদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের অংশীদার ও মালিক তৈরি করার চেষ্টা চলছে।’
উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন বিজন ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর ধরে এই বাজার নিয়ে কাজ করছি এবং প্রতি বছর অন্তত ৫০০টি পিচ শুনি। গত পাঁচ বছরে প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার পিচ শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, কোথাও চাকরি করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা প্রতিষ্ঠাতারা অনেক ক্ষেত্রে ভালো করছেন।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, কনসালটিং প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য কীভাবে আসে?
বিজন ইসলাম বলেন, ‘এই খাতে লিগ্যাসি গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাককিনসি, বিসিজি, বেইন ও পিডব্লিউসির মতো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ‘‘কোম্পানি মেমোরি’’ তৈরি হয়। কোনো নতুন সমস্যা সামনে এলে আগের কাজের অভিজ্ঞতা ও তথ্যভান্ডার কাজে লাগিয়ে দ্রুত সমাধান বের করা যায়। আমার মতে, এই কোম্পানি মেমোরি এবং দক্ষ জনবলই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি তৈরি করে।’
বিজন ইসলাম এ বিষয়ে আরও বলেন, ‘লাইটক্যাসল সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে ‘‘এক্সপোর্ট বাংলাদেশ’’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার কাজও রয়েছে। আমার মতে, সরকার কোনো প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে চাইলে সেটিকে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনা করা প্রয়োজন। সরকারি মালিকানা থাকলেও ব্যবস্থাপনায় আলাদা কাঠামো ও পেশাদারত্ব থাকা দরকার।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চান সঞ্চালক।
বিজন জানান, গত প্রায় ১০ বছরে লাইটক্যাসল বাংলাদেশে ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ স্বল্পমেয়াদে নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময়। প্রায় ২০ কোটি মানুষের বাজার, ভৌগোলিক অবস্থান, কম বিতরণ ব্যয়, বাড়তে থাকা মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং ডিজিটালাইজেশনের কারণে দেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে।
বিজনের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, রাইড শেয়ারিং ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মতো খাতের ডিজিটালাইজেশনের বড় পরিবর্তন ইতিমধ্যে হয়েছে। তাঁর মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতে নতুন সুযোগ এবং কৃষিসহ নানা খাতের সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ইতিবাচক।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের আশাবাদের কথা জানিয়ে বিজন ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়ার মতো অর্থনীতির পর্যায়ে যেতে পারে বলে আমি মনে করি।’