বৃক্ষমেলা

কংক্রিটের নগরে যেন এক টুকরো বনভূমি

গাছের চারা বাছাই করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাণিজ্য মেলা মাঠের জাতীয় বৃক্ষমেলায়। ছবি: প্রথম আলো
গাছের চারা বাছাই করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাণিজ্য মেলা মাঠের জাতীয় বৃক্ষমেলায়।  ছবি: প্রথম আলো

‘অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান/ প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ,’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতায় এভাবে গাছপালার গুণগান করেছেন। জাতীয় বৃক্ষমেলায় পা রাখতেই বারবার মনে পড়ছিল।

‘সবুজে বাঁচি, সবুজ বাঁচাই, নগর-প্রাণ-প্রকৃতি সাজাই’ প্রতিপাদ্যে শুরু হয়েছে জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা। বন অধিদপ্তরের উদ্যোগে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাণিজ্য মেলার মাঠে মাসব্যাপী এ মেলা চলবে প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত।

নিত্যদিনের যানজট ঠেলে মেলা প্রাঙ্গণে ঢুকতেই সবুজের ঝাপটা এসে চোখে লাগে। মনে হয় কংক্রিটের নগরীতে এক টুকরো বনভূমি, যেখানে কিছুক্ষণের জন্য প্রশান্তি মিলবে রাজধানীবাসীর। মেলাজুড়ে সৌন্দর্য ছড়িয়েছে নানা জাতের ফুল, ফল, ঔষধি, ভেষজ, শোভাবর্ধক গাছের সমারোহ। রঙিন ফুলে প্রজাপতির ওড়াউড়ি কিংবা গাছপাকা দেশি-বিদেশি ফল মেলায় আসা দর্শনার্থীদের আগ্রহের মাত্রা বাড়িয়েছে।

গুলশানের সামিরা চৌধুরী বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে নানা জাতের অর্কিড, করমচা, কামরাঙা, লেবুগাছ কিনেছেন। তিনি জানান, প্রতিবছর মেলায় তিনি বেশ কয়েকবার আসেন। তাঁর শোবার ঘর, বাসার ছাদ, বারান্দায় সবখানেই গাছ রাখেন। তবে গাছের পরিচর্যা সহজ হওয়ায় বিদেশি ফলের পরিবর্তে তিনি দেশি ফলের গাছই বেছে নেন।

গাজীপুরের মশিউর রহমানের শখ ফলের বাগান করা। তিনি সকালে মেলায় এসে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে বেশ কয়েক জাতের আম, মাল্টা, কমলাগাছ কিনেছেন। তবে থাইল্যান্ডের হানি ডিউ জাতের আমের গাছটি কিনে তিনি বেজায় খুশি। গাছটির দাম পড়েছে আট হাজার টাকা।

মশিউর রহমান গাছটি কিনেছেন পরিবেশ সহায়ক নার্সারি থেকে। এ নার্সারির স্বত্বাধিকারী ফোরকান আলম বলেন, এ বছর ফলের গাছের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ বেশি। তাঁর নার্সারিতে ফুল, ফল, ভেষজ মিলিয়ে প্রায় ৪০০ ধরনের গাছ রয়েছে। তবে হানি ডিউ, তোতাপুরি, ব্রুনাইকিং, গৌরমতি জাতের আম বেশি চলছে।

১৮ জুলাই শুরু হওয়া মেলায় ১০০টি স্টল আছে। এর মধ্যে সাতটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টল ১৩টি।

মেলাঘুরে দেখা গেছে, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থী স্টল ঘুরে ঘুরে গাছ দেখছেন। বিক্রয়কর্মীর কাছ থেকে গাছের নাম, কত দিনে ফল বা ফুল আসবে জেনে নিচ্ছেন। দরদাম আর পছন্দ মিলে গেলেই গাছটি কিনে ফেলছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ফলের গাছ। আম, পেয়ারা, কমলা, লেবু, চালতা, কতবেল, জাম্বুরা, মাল্টা, আমলকীর পাশাপাশি আলুবোখারা, সাতকরা, শরীফা, ডে-ফল, ক্যাকটাস, আভোকাডো ফলের বিক্রি বেশি হচ্ছে।

ঘরের শোভাবর্ধনকারী গাছের চাহিদাও কম নয়। সারোয়ার হোসেন ব্লিডিং হার্ট, অ্যারোমেটিক জুঁই, রঙ্গন, কাঠগোলাপ, ক্যামেলিয়াসহ বেশ কিছু ফুলের গাছ কিনেছেন। একটি হাসনাহেনাগাছের দরদাম করতে করতে মিরপুরের এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আজ শুধু ফুলের গাছ কিনব।’ বন অধিদপ্তরের সামাজিক বন বিভাগের (ঢাকা) ফরেস্ট রেঞ্জার মো. মনিরুজ্জামান জানান, অন্য বছরের তুলনায় এবার দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি। বিক্রিও হচ্ছে বেশ। গতকাল পর্যন্ত মেলায় দুই লাখ গাছ বিক্রি হয়েছে, যার দাম ৭৫ লাখ টাকা। এভাবে বিক্রি হলে মেলা শেষে মোট বিক্রি ১০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তাঁর আশাবাদ।