প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের ২০০ মিটার অংশ ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ ট্রাক টার্মিনাল।

রামচন্দ্রপুর খালের শুরু আছে, শেষও আছে। এই খালের শুরু বুড়িগঙ্গা নদীতীরের চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকা থেকে। এরপর মোহাম্মদপুরের বছিলা, চাঁদ উদ্যান হয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ ঘুরে খালটি বাড়ইখালী এলাকা দিয়ে আবার বুড়িগঙ্গাতেই মিশেছে। তবে মাঝে বছিলার লাউতলা বাজার এলাকায় খালের প্রায় ২০০ মিটার হারিয়ে গেছে। সেখানে খাল ভরাট করে গড়ে উঠেছে অবৈধ ট্রাক টার্মিনাল। আর এই টার্মিনালে দোকান বানিয়ে, ট্রাক রাখার ভাড়াসহ মাসে চালকদের ইউনিয়নের মাসে বাণিজ্য হয় অন্তত সাত লাখ টাকা।
বছিলা, ঢাকা উদ্যানসহ আশপাশের এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ এই খাল। হঠাৎ খালের গতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারী বৃষ্টি হলেই ওই এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। পানি নেমে যেতেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। বছিলা গার্ডেন সিটির বাসিন্দা আফজাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখন বৃষ্টি হলেই আশপাশের অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। সাবেক কাউন্সিলরের লোকজন তিন-চার বছর আগে লাউতলা বাজার এলাকায় খালে মাটি ফেলে ভরাট করেন। যে অংশে টার্মিনাল করা হয়েছে, সেখানে খালের প্রস্থ ছিল প্রায় ১০০ মিটার। তিনি বলেন, খালপাড়ের বাড়ির মালিকেরাও সুযোগ বুঝে খালের জায়গা দখল করেছেন।
খালের জায়গা দখল করে ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি কোনোভাবেই মানা যায় না।স্থপতি ইকবাল হাবিব
গত সোমবার বছিলার লাউতলা বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মোহাম্মদপুর-বছিলা সড়কে বটতলা কালভার্ট এলাকায় খালের প্রায় ২০০ মিটার অংশ আবর্জনা, বালু ও মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে। ভরাট করা জায়গায় টার্মিনাল তৈরি করে ট্রাক রাখা হচ্ছে। টার্মিনালের ভেতরে টিনের অন্তত ৩০টি দোকানঘর তুলে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ দোকানে গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রি ও মেরামত করা হয়। এ ছাড়া ভরাট করা জায়গায় দ্বিতল একটি ভবন বানিয়ে ট্রাকচালক ইউনিয়নের কার্যালয় করা হয়েছে, যেখানে বড় সাইনবোর্ডে লেখা ‘বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়ন, মোহাম্মদপুর শাখা’।
ট্রাকচালকেরা বলছেন, জায়গা না থাকায় মরা খাল ভরাট করে তিন বছর আগে তাঁরা ট্রাক টার্মিনাল করেছেন। আগে জায়গাটা খালি পড়ে ছিল। এই ট্রাক টার্মিনাল আগে ছিল গাবতলী-সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়কের ভাঙা মসজিদ এলাকায়। সেখান থেকে উচ্ছেদের পর সাবেক কাউন্সিলর (৩৩ নম্বর ওয়ার্ড, ঢাকা উত্তর সিটি) তারেকুজ্জামান রাজীবের সহায়তায় এখানে নতুন টার্মিনাল করেছেন তাঁরা। তখন তাঁরা প্রতি রাতে ট্রাকে করে মাটি এনে জায়গাটি ভরাট করেছেন।
উল্লেখ্য, রাজীব বর্তমানে মাদক মামলায় জেলে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখলসহ নানা অভিযোগ উঠেছে।
পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১১ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ করেছিল। তখন খালের ওপর সীমানাদেয়াল তুলে পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয়। কবরস্থানের ভেতরের অংশটিকে বানানো হয় লেক। আর পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে কবরস্থানের উত্তর দিকে খালের প্রায় ২০০ মিটার অংশ শুকিয়ে যায়।
গত বছরের ডিসেম্বরে ওয়াসার কাছ থেকে রাজধানীর খালগুলো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শওকত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রামচন্দ্রপুর খালের কিছু অংশ গাবতলী-সদরঘাট বেড়িবাঁধের বাইরে পড়েছে। বেড়িবাঁধের বাইরে থাকা খালগুলো সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়নি। রামচন্দ্রপুর খালের যে অংশটুকু বেড়িবাঁধের ভেতরে, শুধু সেই অংশের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। বাকিটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের। তিনি বলেন, এই খালের যে অংশটুকু ভরাট করে ট্রাকস্ট্যান্ড করা হয়েছে, তা পাউবোর আওতাধীন।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আইনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশন রায়েরবাজার কবরস্থান নির্মাণের সময় রামচন্দ্রপুর খালের ওপর সীমানাদেয়াল তুলে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, যে কারণে সেখানে খাল শুকিয়ে যায়। তিনি বলেন, রামচন্দ্রপুর খাল খননের একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রকল্প অনুমোদিত হলে খাল খননের পাশাপাশি দখলমুক্ত করা হবে।
খাল দখল করে গড়ে ওঠা টার্মিনালের দোকানগুলো থেকে মাসে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে ভাড়া ওঠানো হয় বলে জানান চালকেরা। আর টার্মিনালে ট্রাক রাখতে হলে ট্রাকপ্রতি দৈনিক ৩০ টাকা দিতে হয়।
বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়ন মোহাম্মদপুর শাখার কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, টার্মিনালে প্রায় ৭০০টি ট্রাক থাকে। ভেতরে জায়গা না হওয়ায় বাইরে রাস্তার ওপরও দুই-আড়াই শ ট্রাক রাখা হয়।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টার্মিনালের ৭০০ ট্রাক থেকে দৈনিক ৩০ টাকা হিসাবে দিনে ওঠে ২১ হাজার টাকা। এক মাসে ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া টার্মিনালের ৩০টি দোকান থেকে মাসে গড়ে চার হাজার টাকা করে ধরলেও ভাড়া আসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে টার্মিনাল থেকে আয় সাড়ে সাত লাখ টাকা। এই টাকা চালক ইউনিয়নের কাছে যায়। আগে টাকার একটি অংশ নিতেন কাউন্সিলর। বাকি টাকা নেতারা ভাগ করে নিতেন। রাজীব কারাগারে যাওয়ার পর টাকার ভাগ এখন কে নেন, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাননি তাঁরা।
খাল ভরাট করে অবৈধ ট্রাক টার্মিনাল গড়ে তোলার বিষয়ে চালক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ নসু মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল হোসেনের সঙ্গে দেখা করতে ঈদের আগে ও পরে চারবার লাউতলা বাজার টার্মিনালে গিয়েও তাঁদের পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে নসু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর স্ত্রীর পরিচয় দেওয়া এক নারী বলেন, নসু মিয়া অসুস্থ। এরপর আরও কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও ধরেননি। আর সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল সাংবাদিক পরিচয় শোনার পর ফোন রেখে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, খালের জায়গা দখল করে ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি কোনোভাবেই মানা যায় না। এটি উচ্ছেদ করতেই হবে। আর রায়েরবাজার কবরস্থানের ভেতরে থাকা খালের সঙ্গে লাউতলা এলাকায় খালের সংযোগ তৈরি করতে হবে। এই কাজ সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে।