রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় টিসিবির পণ্য কিনতে মানুষের ভিড়
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় টিসিবির পণ্য কিনতে মানুষের ভিড়

ছেলের পরিবারের জন্য টিসিবির পণ্য কিনতে অপেক্ষা রওশনের

পান্থপথের বাসিন্দা রওশন বেগম। ঝিগাতলার সীমান্ত স্কয়ার মার্কেটে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে ফার্মগেটের খামারবাড়ি মোড়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

রওশন জানান, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে তেল, ডাল ও চিনি কিনবেন। তাই সকাল সাড়ে সাতটায় তিনি ওই জায়গায় যান, যাতে লাইনের প্রথম দিকে দাঁড়ানো যায়। তবে রওশনের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখনো সেখানে টিসিবির ট্রাক পৌঁছায়নি। বেলা সাড়ে ১১টার কিছু পর টিসিবির ট্রাক সেখানে পৌঁছায়। রওশন পাঁচজনের পেছনে লাইনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান। দুপুর ১২টার দিকে তিনি দুই কেজি করে ডাল ও চিনি এবং দুই লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল কেনেন।

সকালে রাজধানীর খামারবাড়ি মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায় শ খানেক নারী-পুরুষের জটলা। কেউ বসে আছেন সড়ক বিভাজকের গাছের ছায়ায়। কেউ দাঁড়িয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। অপেক্ষমাণ একাধিক লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা সবাই টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাকের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাই এই ট্রাক যে পথে আসবে, আলাপ–গপ্পোর ফাঁকেও সেই মোড়ের দিকে সবার সতর্ক দৃষ্টি। ট্রাক পৌঁছানোমাত্রই যেন দ্রুত লাইনে দাঁড়িয়ে পড়া যায়।

রওশন বেগমের মতো টিসিবির ট্রাকের জন্য অর্ধশতাধিক নারী অপেক্ষমাণ। রওশন প্রথম আলোকে জানান, সকাল সকাল এসেছেন, যাতে কোনোভাবেই মিস না হয়। কারণ, দেরি করে এলে সিরিয়াল অনেক পেছনে পড়ে যায়। পণ্য কেনার সুযোগ পেতে পেতে অনেক পণ্য, বিশেষ করে তেল ও ডাল পাওয়াই যায় না।

রওশন বলেন, ‘মার্কেটে ক্লিনারের চাকরি করি৷ তাই সব দিন আসার সুযোগ পাই না। আজ মঙ্গলবার, মার্কেট বন্ধ, আমারও ছুটি, তাই আসছি।’

তবে সকাল থেকে কষ্ট করে তেল, ডাল ও চিনি রওশন নিজের জন্য কিনতে আসেননি। স্বামীহারা রওশন থাকেন নারীদের মেসে। সেখানে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে থাকা ও খাওয়া যায়।

তাহলে পণ্য কিনে কী করবেন, এমন প্রশ্ন করতেই রওশন জানান, করোনার আগে ছেলে, ছেলের বউ ও নাতনিকে নিয়ে কলাবাগানে এক রুমের বাসায় ৬ হাজার ৫০০ টাকায় ভাড়া থাকতেন। ছেলের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ছোট চাকরি ছিল। ছেলের বউও কাজ করতেন একটি কল সেন্টারে। কিন্তু করোনার শুরুতে ছেলের খাদ্যনালির অসুখ হয়। এতে চাকরি ছাড়তে হয়। করোনা পরিস্থিতিতে চাকরি চলে যায় ছেলের বউয়েরও।

কিছুদিন একাই সংসার চালান রওশন। কিন্তু বেশি দিন পারেননি। বাসাভাড়া বাবদ ১৮ হাজার বকেয়া হয়। উপায় না দেখে বাসাটি ছেড়ে দিতে হয়। এখন মাসে এক হাজার টাকা করে বকেয়া পরিশোধ করেন রওশন।

ছেলের পরিবার মিরপুরে শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে। নিজে থাকছেন মেসে। এখন ছেলের পরিবারের জন্য তেল, চিনি ও ডাল কিনতে এসেছেন তিনি।

রওশন বলেন, ‘২৪ বছর আগে স্বামী মারা গেছে। একা ছেলেকে মানুষ করেছি। ছেলে এখন কিছুটা সুস্থ। বউও চাকরি খুঁজতাছে। অভাবে আছে। তাদের জন্যই ডাল-তেল কিনতে আসছি।’

তবে আজ আর ছেলের বাসায় গিয়ে ফিরে আসা সম্ভব হবে না, তাই সামনে মঙ্গলবার ছুটির দিনে আবার যাবেন বলে জানান রওশন।

টিসিবির পণ্যের পরিবেশক মেসার্স আনু এন্টারপ্রাইজের মনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, টিসিবি থেকে ৬০০ লিটার তেল, অর্থাৎ ২ লিটারের ৩০০ বোতল, ৪০০ কেজি ডাল ও ৫০০ কেজি চিনি দেওয়া হয়েছে। তেল ৩০০ জনকে, ডাল ২০০ জনকে ও চিনি ২৫০ জনকে দেওয়া যাবে। তেল ১০০ টাকা লিটার, চিনি ও ডাল প্রতি কেজি ৫৫ টাকায় বিক্রি করা হয় বলেও জানান তিনি।