টঙ্গীর দত্তপাড়া হাউজিং

জমি গৃহায়ণের, বিক্রি করে দখলদার

স্বাধীনতার আগে ৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। বড় অংশই এখন বেদখল। গড়ে উঠেছে চারতলা ভবনও।

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের এই বেদখল জমিতে বাস করে প্রায় এক লাখ মানুষ। অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে তিন থেকে চারতলা ভবন। সম্প্রতি টঙ্গীর দত্তপাড়া হাউজিংয়ে (এরশাদনগর)
ছবি: প্রথম আলো

টঙ্গীর দত্তপাড়া হাউজিং এস্টেটে চারতলা একটি বাড়ির ‘মালিক’ মোহাম্মদ আলী। বাড়িটি তিনি সম্প্রতি ১৮ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন বলে দাবি করেছেন। এর বাইরে ‘জমির কাগজ’ ও ‘সামাজিক উন্নয়ন’-এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে আরও ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।

মোহাম্মদ আলী কার কাছ থেকে ওই বাড়ি কিনেছেন, তা বলেননি। তবে দত্তপাড়া হাউজিং এস্টেটের মূল মালিক জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)। কিন্তু এস্টেটের প্রায় ৯৭ একর জমির পুরোটাই বেদখল। দখলদারেরা সেখানে রীতিমতো স্ট্যাম্পে চুক্তি করে জমি কেনাবেচা করেন। নির্মাণ করেন ভবন। এই কেনাবেচায় মধ্যস্থতা করেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সর্বনিম্ন বাজারদর (মৌজা রেট) অনুযায়ী এই জমির দাম প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

দত্তপাড়া হাউজিংয়ের বাসিন্দারা জানান, সেখানে বাড়ি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোনো দলিল করা হয় না। শুধু স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি হয়। দলিল না হলেও এভাবে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বাড়ি কেনার ঝুঁকি নেওয়ার কারণ, ক্রেতারা মনে করেন, গৃহায়ণ এই জমি কখনো উদ্ধার করতে আসবে না। চাইলেও উদ্ধার করতে পারবে না।

গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ উল্ল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, এভাবে গৃহায়ণের জমি দখল ও বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। যদি কেউ এ কাজ করেন, তবে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। জমি বেদখল থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, স্বল্প জনবলের কারণে সব জমি দেখভাল করা কঠিন।

গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পিত আবাসন গড়ার উদ্দেশ্যে টঙ্গীর দত্তপাড়ার এই জমি ১৯৬২-৬৩ অর্থবছরে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। দেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ঢাকার ছিন্নমূল ও বস্তিবাসীর একাংশকে পুনর্বাসনের জন্য সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরশাদের শাসনামলে পুনর্বাসিত পরিবারগুলোকে একটি করে ৭০০টির মতো ঘর করে দেওয়া হয়। ঘর করার পরও অর্ধেকের বেশি জমি খালি ছিল। এখন একটু জমিও ফাঁকা নেই। অবশ্য সেখানে কার দখলে কত জমি, পুনর্বাসিত ও অবৈধ দখলদারের সংখ্যা কত, তা জানা নেই গৃহায়ণের।

কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব বাংলাদেশের (সিএজি) সর্বশেষ (২০১৯-২০) নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই জমিতে ১ হাজার ২০টি আধা পাকা ঘর ও তিন শতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনা থেকে গৃহায়ণ কোনো ভাড়া তুলতে পারে না। প্রতিবেদনে অধিগ্রহণ করা জমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব না পালন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের উন্নত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে ওই এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়ার চিন্তা আছে তাঁদের। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ঠিক করা হবে ভাড়ার ভিত্তিতে, না দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে বস্তিবাসীরা ফ্ল্যাট পাবেন।
বিজয় কুমার মণ্ডল, (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প)

সম্প্রতি দত্তপাড়া হাউজিং এস্টেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তিন থেকে চারতলার বহু ভবন গড়ে উঠেছে। দত্তপাড়ায় চারতলা একটি বাড়ি করেছেন মনোয়ারা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একসময় এই জমি সামছু নামের একজনের দখলে ছিল। সামছুর কাছ থেকে জমির দখল কিনে নেন কুফর উদ্দিন। ১০-১২ বছর আগে কুফর উদ্দিনের কাছ থেকে জমির দখল কেনে মনোয়ারার পরিবার। মনোয়ারা বলেন, চারতলা বাড়িতে ১০টি কক্ষ আছে। ছয়টিতে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা থাকেন। বাকি চারটি কক্ষ ভাড়া দিয়েছেন।

মনোয়ারার বাড়ির পাশে আছে চারতলা একটি বেসরকারি স্কুল। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, চার লাখ টাকায় দুজনের কাছ থেকে তিনি জমির দখল কিনেছেন।

এসব ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদন নেওয়া হয় না বলে স্বীকার করেছেন বাসিন্দারা। স্থানীয় লোকজন জানান, দত্তপাড়া হাউজিংয়ে বাস করেন অন্তত এক লাখ মানুষ। এলাকাটি এখন এরশাদনগর নামে পরিচিত।

জমিটি নিয়ে গৃহায়ণের পরিকল্পনা কী—জানতে চাইলে সংস্থাটির সদস্য (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প) বিজয় কুমার মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের উন্নত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে ওই এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়ার চিন্তা আছে তাঁদের। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ঠিক করা হবে ভাড়ার ভিত্তিতে, না দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে বস্তিবাসীরা ফ্ল্যাট পাবেন।

তবে দত্তপাড়া হাউজিংয়ে এমন কোনো প্রকল্প বাসিন্দারা চান না বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কাউন্সিলর ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, সরকারের অন্য প্রকল্পে দেখা গেছে, জমির পুরোনো বাসিন্দারাই ফ্ল্যাট পান না। তাই এমন কোনো প্রকল্প ওই এলাকায় হতে দেওয়া হবে না।

দত্তপাড়া ছাড়াও ঢাকার মিরপুর এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, হালিশহর, ফিরোজশাহ, শের শাহ ও কৈবল্যধাম এলাকায় গৃহায়ণের প্রায় ৩ হাজার ৭৪০ একর জমি বেদখল। সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব জমির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা।

দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এভাবে গৃহায়ণের জমি বেদখল হয়ে গেছে। যাঁদের এগুলো দেখভালের দায়িত্ব ছিল, তাঁদের সঙ্গে দখলদারদের যোগসাজশ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।