হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে, ঝুঁকিতে শিশুরা

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশকনিধনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলেও প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে।

রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে
প্রথম আলো

জ্বর আসার পর দেরি না করে পাঁচ বছরের শিশু রায়হানের ডেঙ্গু পরীক্ষা করান অভিভাবকেরা। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রায়হানের রক্তের প্লাটিলেট (একধরনের উপাদান) অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। এখন কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে শিশুটিকে।

রায়হানদের বাসা পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে। তার নানা নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করান। ভর্তির দিনে রায়হানের প্লাটিলেট ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার। এই সংখ্যা নেমে (গতকাল রোববার) এসেছে ৩৫ হাজারে। এ অবস্থায় চিকিৎসকেরা রক্তের ব্যবস্থা করে রাখতে বলেছেন।

রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১৬৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিল। এর মধ্যে ৩৪ শিশু, ৫৮ জন নারী এবং পুরুষ ৭৩ জন।

চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা এখন আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই শিশুরা যাতে অক্রান্ত না হয়, সে জন্য প্রতিটি বাসায় অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ সম্পর্কে তাঁরা বলছেন, জ্বর, মাথাব্যথা, চোখব্যথা, মাংস পেশিতে ব্যথা, শরীরে র‌্যাশ ওঠা, মুখ থেকে রক্তক্ষরণ, পেট ফুলে যাওয়া, শরীরে পানি আসা। এসব লক্ষণ নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে আসছে।

মিটফোর্ড হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রায়হানের শয্যার পাশে রাদিয়া ইসলাম নামের আরেক শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। ছয় বছর বয়সী এই শিশুর বড় ভাই মো. জুরাইজ বলেন, ঘুমানোর সময় দিনের বেলায়ও তাঁরা মশারি টাঙিয়ে ঘুমান। এরপরও কীভাবে তাঁর বোন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, তা বুঝতে পারছেন না। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা জুরাইজ বলেন, তাঁদের এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি।

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই কিছুদিন ধরে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়ছে। দুই সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলেও প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩৭ জন। এর মধ্যে ঢাকাতেই ভর্তি হয়েছেন ২১৮ জন। আর চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৯৫ জন।

* দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ২৩৭ জন। এর মধ্যে ঢাকাতেই ভর্তি হয়েছেন ২১৮ জন। * চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৯৫ জন।

ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এক নারী গত শনিবার মারা গেছেন বলে জানান মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মো. রশিদ-উন-নবী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৩০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। রোগী আরও বাড়লে যাতে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য কয়েকটি ওয়ার্ড তৈরি করে রাখা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম বলেছে, এ বছর ডেঙ্গু সন্দেহে চারজনের মৃত্যুর তথ্য তারা পেয়েছে। তবে এসব মৃত্যু ডেঙ্গুতেই হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার জন্য সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়েছে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চললেও ২০১৯ সালে ব্যাপকভাবে এ রোগ ছড়ায়। সে সময় সরকারি হিসাবে লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত ও দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়।

মিটফোর্ড হাসপাতালের ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রিকশাচালক মো. ইসমাঈল। তাঁর বাসা রাজধানীর মানিকনগরে। সাত দিন ধরে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। প্রথম পাঁচ দিন বাসায় ছিলেন। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় গত শুক্রবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বললেন, এলাকায় প্রচুর মশা।

মশারি টাঙাতে অনীহা

মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এখনো আলাদা ইউনিট চালু হয়নি। মেডিসিন বিভাগে ভর্তি রোগীদের সঙ্গেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এই বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগীকেই হাসপাতালের পক্ষ থেকে মশারি দেওয়া হয়েছে। তবে গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ রোগী মশারি ব্যবহার করছেন না।

হাসপাতালের ২ নম্বর ভবনের ছয়তলায় মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ছেলে নাহিয়ান বিন জিয়াউলের পাশে বসা ছিলেন মা নাজমুন নাহার। কিন্তু মশারি দেওয়া হলেও তা টানাননি তাঁরা। মশারি না টানানোর কারণ জানতে চাইলে নাজমুন নাহার বলেন, মশারি টানালে ফ্যানের বাতাস গায়ে লাগে না।

এই ওয়ার্ডেই চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত আরেক রোগী পূর্ব জুরাইনের বাসিন্দা নাসিদ মশারি না টানানোর বিষয়ে বললেন, রক্তের নমুনা দিতে তিনি হাসপাতাপালের নিচতলায় যান একটু আগে। তখন মশারি খুলে গিয়েছেন।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির খারাপের দিকে যাচ্ছে জানিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছেন, প্রতিদিন যে হারে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে সামনে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। করোনায় আক্রান্ত ১০ জন রোগীকে একজন চিকিৎসক দেখভাল করতে পারেন। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা খারাপ হলে একজন রোগীর জন্য একজন চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়।

মিটফোর্ড হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রোগীদের মশারি সরবরাহ করা হলেও তারা ব্যবহার করছে না। এটা উদ্বেগজনক।