রাজধানীতে এলোমেলোভাবে বাস থামানোর কারণে অন্য যানবাহন চলাচলে তৈরি হয় প্রতিবন্ধকতা, সৃষ্টি হয় যানজটের
রাজধানীতে এলোমেলোভাবে বাস থামানোর কারণে অন্য যানবাহন চলাচলে তৈরি হয় প্রতিবন্ধকতা, সৃষ্টি হয় যানজটের

নারীবাস, সাইকেলসেবা, মনোরেল—ঢাকায় গণপরিবহনে আর কী কী নতুন আসছে

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে আছে স্বল্প মেয়াদে নারীদের জন্য আলাদা বাসসেবা ও বাইসাইকেল রাইড শেয়ারিং, মধ্য মেয়াদে বাসরুট রেশনালাইজেশন, বিদ্যুৎ–চালিত বাস চালু এবং মেট্রোরেলের পাশাপাশি লাইট বা মনোরেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে দুটি বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করছে। এর বাইরে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ৩৮ পৃষ্ঠার একটি খসড়া কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এতে আগামী ছয় মাস এবং আগামী অর্থবছরে করণীয় কী, তা উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে সড়ক ও পরিবহন খাতে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হবে, তার বিবরণ আছে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ৩৮ পৃষ্ঠার একটি খসড়া কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এতে আগামী ছয় মাস এবং আগামী অর্থবছরে করণীয় কী, তা উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে সড়ক ও পরিবহন খাতে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হবে, তার বিবরণ আছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে আসা পরামর্শ এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা—দুটির সমন্বয়ে কাজ চলছে। মূল লক্ষ্য হলো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা এবং যাত্রীসেবা উন্নত করা। অচিরেই এর ফল পাওয়া যাবে।’

নারীদের জন্য বিশেষ বাস

নারীদের সার্বক্ষণিক নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে ঢাকার কিছু রুটে ‘নারী যাত্রী বাস (পিংক বাস)’ চালুর স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ও ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে আসা পরামর্শ এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা—দুটির সমন্বয়ে কাজ চলছে। মূল লক্ষ্য হলো, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা এবং যাত্রীসেবা উন্নত করা। অচিরেই এর ফল পাওয়া যাবে।
মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সচিব, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ

ওই কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে আটটি রুটে ৯টি বাস চালু করা হবে। এই বাসগুলোতে চালক ও সহকারী হিসেবে নারীরাই কাজ করবেন। এ জন্য নারী চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া হবে। সরকার মনে করছে, এতে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ দুই-ই বাড়বে।

এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব যান হিসেবে বাইসাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে কিছু প্রণোদনা রাখা হয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায়।

এর মধ্যে আছে উত্তরা মেট্রোরেল স্টেশনকেন্দ্রিক রাইড শেয়ারিং সাইকেল সেবা চালুর উদ্যোগ। এর আওতায় উত্তরা এলাকায় ছয়টি সাইকেলস্ট্যান্ড নির্মাণ ও ১৫০টি সাইকেল সরবরাহ করা হবে। প্রায় ৬ কিলোমিটার সাইকেল লেন তৈরি করা হবে। এই উদ্যোগ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) বাস্তবায়নের কথা ভাবছে সড়ক মন্ত্রণালয়।

প্রাথমিকভাবে নারীদের জন্য আটটি রুটে ৯টি বাস চালুর পরিকল্পনা আছে সরকারের

বাস রুট রেশনালাইজেশন ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা

ঢাকার গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে দীর্ঘদিন ধরে বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশন ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে এ বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা আনা, সমন্বিত ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনা এবং বাসরুট র‍্যাশনালাইজেশন করার কথা বলেছিল।

এবার ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় এ নিয়ে আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মধ্যমেয়াদি এই পরিকল্পনায় রাজধানীর বিদ্যমান ২১ ও ২৬ নম্বর রুটে নতুন নামানো এবং আরও কিছু নতুন রুট চালুর কথা বলা হয়েছে।

কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে আটটি রুটে নারীদের জন্য ৯টি বাস চালু করা হবে। এই বাসগুলোতে চালক ও সহকারী হিসেবে নারীরাই কাজ করবেন। এ জন্য নারী চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া হবে। সরকার মনে করছে, এতে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ দুই-ই বাড়বে।

বাসরুট রেশনালাইজেশন হচ্ছে—রাজধানীর সব কটি বাস রুটকে অল্প কয়েকটি রুটে নিয়ে আসা। অল্প কিছু কোম্পানির অধীনে একই রঙের বাস চলাচল করবে। কেউ কারও আগে যাওয়ার চেষ্টা করবে না। নির্দিষ্ট স্থানে বাস থামবে। দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খোলা ও বন্ধ হবে।

২০১৮ সালে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বোর্ড সভা সিদ্ধান্ত নেয়, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিষেবা (বাসরুট রেশনালাইজেশন) প্রবর্তনের অংশ হিসেবে ঢাকায় নতুন করে বাসের রুট পারমিট দেওয়া হবে। রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় এরপর কয়েকটি পথে বাস নামানো হয়। তবে এ ব্যবস্থা এখন আর কার্যকর নেই।

বিদ্যুৎ–চালিত বাস

গণপরিবহনে জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ–চালিত বাস চালুর পরিকল্পনাও আছে সরকারের। প্রথম ধাপে শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের স্কুলবাস আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গণপরিবহন হিসেবে বিদ্যুৎ–চালিত বাস আমদানি করা হলে শুল্ক ছাড়ের কথাও বলা হয়েছে ১৮০ দিনের পরিকল্পনায়।

গণপরিবহনের মানোন্নয়নে বাসের কন্ডাক্টর ও সুপারভাইজারদের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে সড়ক মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায়। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঁচ হাজার কর্মীকে এই লাইসেন্স দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী বাস এটি। বাসটির কাঠামোর (বডি) পেছনের অংশ ভেঙে পড়া ঠেকাতে রশি ও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ১২ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে

এ ছাড়া কল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য মেট্রোরেল ও দূরপাল্লার পরিবহনে বিশেষ ভাড়া ছাড় চালুর নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি আড়াই হাজার পরিবহনশ্রমিককে ইউনিফর্ম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে থাকবে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন পোশাক ও জুতা।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসরুট রেশনালাইজেশন পূর্ণরূপে চালু করা গেলে আলাদা করে চালকদের নিয়ে পরিকল্পনার দরকার হবে না।

মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল

গণপরিবহনের সর্বোচ্চ স্তর হলো মেট্রোরেল। ঢাকায় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত একটি মেট্রোরেল লাইন চালু আছে। এটি কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ চলছে।

রাজধানীর অনেক এলাকা এতই ঘনবসতিপূর্ণ যে সেখানে মেট্রোরেল নেওয়া সম্ভব নয়। সেসব জায়গায় মনোরেল হতে পারে। অর্থাৎ মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহনের একটা সমন্বয় তৈরি করা।
সামছুল হক, অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। চালুটি ছাড়া আরও দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প চলমান। আরেকটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া আছে। কিন্তু মেট্রোরেল নির্মাণে বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান সরকার মেট্রোরেলের পাশাপাশি লাইট/মনোরেল চালুর করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

মনোরেল হচ্ছে একটিমাত্র লাইনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী পরিবহন। একটিমাত্র বিমের ওপর ট্রেন চলাচল করে। এর জন্য আলাদা দুটি লাইন দরকার হয় না। প্রচলিত রেল বা মেট্রোরেলে দুটি লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল করে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলমান মেট্রোরেলের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় বড় খুঁটির ওপরে তার টানতে হয়েছে। মনোরেলে লাইনের সঙ্গেই বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা যুক্ত থাকে। ফলে খুঁটি বা তারের জন্য বাড়তি ভার বহনের উপযোগী কাঠামো দরকার হয় না।

উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত একটি মেট্রোরেল লাইন চালু আছে। এটি কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ চলছে

বর্তমানে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতালপথে মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প চলমান আছে। এর আওতায় নর্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত উড়ালপথে মেট্রোরেল হবে। উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয়ে নেওয়া এই মেট্রোরেলের পথটির আনুষ্ঠানিক নাম এমআরটি লাইন-১। এ ছাড়া লাইন-৫ (উত্তর) নামে আরেকটি প্রকল্প চলছে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী, মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত। হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত উড়ালপথে এবং বাকিটা পাতালপথে হওয়ার কথা রয়েছে।

গণপরিবহনে জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনাও আছে সরকারের। প্রথম ধাপে শিক্ষার্থীদের জন্য বৈদ্যুতিক স্কুলবাস আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গণপরিবহন হিসেবে বৈদ্যুতিক বাস আমদানি করা হলে শুল্কছাড়ের কথাও বলা হয়েছে ১৮০ দিনের পরিকল্পনায়।

এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। অন্যদিকে লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর পর বাড়তি ব্যয়ের ধারণা পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস হচ্ছে, দুটি প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় ঠেকতে পারে।

সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি

পরিবহনবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু মেট্রোরেল নয়, লাইট রেল, মনোরেল বিভিন্ন সংস্করণের রেলভিত্তিক সমন্বিত পরিবহন চালু করা দরকার।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে চলছে মনোরেল

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকসহ বিশেষজ্ঞদের মতামত চেয়েছে সরকার।

অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীর অনেক এলাকা এতই ঘনবসতিপূর্ণ যে সেখানে মেট্রোরেল নেওয়া সম্ভব নয়। সেসব জায়গায় মনোরেল হতে পারে। অর্থাৎ মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহনের একটা সমন্বয় তৈরি করা।

সামছুল হক বলেন, ঢাকার পূর্বাঞ্চল-বাসাবো, গোড়ান, মাদারটেক ও পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনেক মানুষ বাস করেন, যেখানে পর্যাপ্ত বাসসেবা নেই। প্রধান সড়ককেন্দ্রিক মেট্রোরেলের বাইরে এসব এলাকায় বিকল্প রেলভিত্তিক বা স্বল্প ব্যয়ে বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।