
বর্ষা এলেই ঢাকার সড়কে ফিরে আসে পুরোনো দুর্ভোগ—কোথাও পিচ উঠে গর্ত, কোথাও সড়ক দেবে উঁচু-নিচু, আবার কোথাও মাসের পর মাস কাটা পড়ে আছে রাস্তা। অথচ সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নে প্রতিবছর দুই সিটি করপোরেশন ব্যয় করছে কোটি কোটি টাকা।
ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শুধু বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতা নয়, বিভিন্ন সংস্থার কাজের জন্য সড়ক কেটে রেখে সময়মতো মেরামত না করা এবং সংস্কারকাজে ধীরগতিও সড়কের দুরবস্থার বড় কারণ। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে পথচারী ও যানবাহনকে, বাড়ছে যানজট ও ভোগান্তি।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় বর্ষায় সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে সড়ক কাটা, কাজ শেষে দ্রুত মেরামত না করা এবং চলমান সংস্কারকাজের দীর্ঘসূত্রতা অনেক জায়গায় দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
কোথাও গর্ত, কোথাও উঁচু-নিচু
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভিনিউর টাউন হল থেকে লালমাটিয়ার বি-ব্লক পর্যন্ত জাকির হোসেন সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ মিটার। এরপর লালমাটিয়ার এফ-ব্লক ঘেঁষে কাজী নজরুল ইসলাম সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও প্রায় ৩৫০ মিটার অংশ। এর সঙ্গে পূর্ব-পশ্চিমে আড়াআড়িভাবে যুক্ত আরও ছয়টি অভ্যন্তরীণ সড়ক। এসব সড়কের প্রায় সব কটিরই কোনো না কোনো অংশ এখন বেহাল। কোথাও পিচ উঠে এবড়োখেবড়ো, কোথাও ছোট-বড় গর্ত। কোনো অংশ দেবে গিয়ে তৈরি হয়েছে উঁচু-নিচু অবস্থা। বৃষ্টির পানি জমে কোথাও গর্তের গভীরতাও বোঝার উপায় নেই।
শুধু জাকির হোসেন সড়ক নয়, উত্তর ও দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।
ডিএনসিসিতে চলতি অর্থবছরে সড়ক, নালা ও ফুটপাত নির্মাণে প্রায় ৫৬৮ কোটি টাকা এবং বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে ৫৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আর ডিএসসিসিতে চলতি অর্থবছরে সড়ক, নালা ও ফুটপাত নির্মাণে প্রায় ২৬৬ কোটি টাকা এবং বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গত ৩১ জুলাই, ১ আগস্ট এবং ১৪ ও ১৫ আগস্ট ডিএনসিসির মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, ফার্মগেট, গুলশান, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, বাড্ডা, শাহজাদপুর, নুরেরচালা, নর্দ্দা, কুড়িল, খিলক্ষেত ও বিমানবন্দর এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।
পরে ২১ ও ২২ আগস্ট ডিএসসিসির বকশীবাজার, লালবাগ, চকবাজার, বেগমবাজার, বংশাল, স্বামীবাগ, কলতাবাজার, আরমানিটোলা, সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, কদমতলী, মুরগিটোলা, নীলক্ষেত, নিউমার্কেট, হাতিরপুল, পরিবাগ, গ্রিন রোড, ধানমন্ডি, মগবাজার, বাসাবো, মাদারটেক, নন্দীপাড়া, মালিবাগ, খিলগাঁও ও গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে একই চিত্র পাওয়া যায়।
‘রাস্তার কোনো জাতই না এইডা’
ডিএনসিসির প্রধান সড়কগুলোর মধ্যে মিরপুর সড়ক, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, বেগম রোকেয়া সরণি, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণি, বিমানবন্দর ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম অ্যাভিনিউ এবং প্রগতি সরণি উল্লেখযোগ্য। এসব সড়কের মধ্যে প্রগতি সরণির কুড়িল থেকে নর্দ্দা বাজার বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ দেখা গেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোনো কোনো গর্ত এত বড় ও গভীর যে বাস বা অন্য কোনো যানবাহন পড়লে এক পাশে হেলে যায়। কোথাও সড়ক দেবে উঁচু-নিচু হয়েছে। পুরো অংশ এবড়োখেবড়ো থাকায় যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে যানজট।
বর্ষায় বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে পটহোল ও ফাটল তৈরি হয়। এগুলো নিয়মিত মেরামত করা হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে প্রতি রাতে প্রায় ৪০ টন অ্যাসফল্ট মিশ্রণ দিয়ে গর্ত ও খানাখন্দ মেরামত করা হচ্ছে।খন্দকার মাহবুব আলম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী-১, ডিএনসিসি
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ইউসুফ আলী বলেন, ‘রাস্তার কোনো জাতই না এইডা। সিএনজির চাক্কা আটকাই যায়। চাক্কা গর্তে পইড়া সাইলেন্সার মাইর খায়। জ্যামের কতা তো আর কইলামই না।’ তাঁর ভাষায়, রাস্তার এমন অবস্থা মেনে নেওয়া কঠিন।
ওই সড়কে মেট্রোরেল লাইন-১ নির্মাণের জন্য পরিষেবা সংযোগ স্থানান্তরের কাজ চলছে।
‘যাত্রীরা গালাগালি করে’
বেগম রোকেয়া সরণির মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে, গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল মোড়ের পথে ডেনসো সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে এবং মিরপুর সড়কের ধানমন্ডি-২৭ নম্বর মোড়ের আগে পদচারী-সেতুর নিচে ছোট-বড় গর্ত ও ভাঙা অংশ দেখা গেছে।
মনে হয় রাস্তায় পাথর আইনা ফালাই রাখসে। কোনো কাজই হইল না। কিন্তু রাস্তা কাইটা রাইখা দিল। সড়কে অলটাইম জ্যাম লাগে, যাত্রীগো কষ্ট হয়।আলম হোসেন, রাইদা পরিবহনের চালক
গাবতলী-পাটুরিয়া ঘাট পথে চলাচলকারী বৈশাখী পরিবহনের চালক সুলতান আলী বলেন, ‘রাস্তায় গাড়ির চাপ থাকলে রানিংয়ে গাতা-গুতা এড়ানো যায় না। তহন গর্তে চাকা পড়ে, ঝাঁকি লাগে, যাত্রীরা গালাগালি করে।’ গর্তে চাকা পড়লে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরে যায় এবং সাসপেনশনের ক্ষতি হয় বলেও জানান এই চালক।
বিমানবন্দর সড়কের ঢাকা রিজেন্সির বিপরীত পাশে ও খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডের আগে বিভিন্ন অংশে পিচ উঠে গেছে। কোথাও সড়কে ফাটল, কোথাও বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয়েছে গর্ত। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর মোড় থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এবং সেখান থেকে বছিলা তিন রাস্তার মোড় পর্যন্তও বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ দেখা গেছে। বিশেষ করে বছিলা তিন রাস্তার মোড়ের সিগন্যাল এলাকায় ভাঙা অংশ পার হতে যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে।
আড়াআড়ি কাটা, মেরামত নেই
সড়কের দুরবস্থার আরেকটি কারণ বিভিন্ন সংস্থার কাজের জন্য সড়ক কেটে রাখা। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই তা দ্রুত মেরামত করা হচ্ছে না।
টেকনিক্যাল মোড় থেকে মিরপুর সড়ক ও বেগম রোকেয়া সরণির সঙ্গে সংযোগকারী অধ্যক্ষ আবুল কাশেম সড়কের প্রিয়াঙ্কা চায়নিজ এলাকার অংশে অন্তত তিন জায়গায় সড়ক আড়াআড়ি কাটা হয়েছে।ঢাকা দক্ষিণ সিটির সড়কে একটু পরপর গর্ত, খানাখন্দ
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের ভাষ্য, বৃষ্টির পর মিরপুর-১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড ও প্রিয়াঙ্কা চায়নিজ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় পানিনিষ্কাশনের জন্য পাইপলাইন বসাতে সড়ক কাটা হয়েছে। তবে কাটা অংশের বাইরেও পানি জমে বিভিন্ন জায়গায় গর্ত ও খানাখন্দ তৈরি হয়েছে।
মিরপুর-১ থেকে টেকনিক্যাল মোড়ের দিকে যাওয়ার পথে ফুটপাতসংলগ্ন একটি অংশ ছয় মাসের বেশি আগে কাটা হলেও মেরামত করা হয়নি। দীর্ঘদিন কাটা অবস্থায় থাকায় আশপাশের সড়কও ধীরে ধীরে ভাঙছে।
মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের ৪ নম্বর অ্যাভিনিউ এবং মোহাম্মদপুরের শেখেরটেকের ৭ নম্বর সড়কেও আড়াআড়ি কাটার চিহ্ন দেখা গেছে।
অভ্যন্তরীণ সড়কেও দুর্ভোগ
প্রধান সড়কের বাইরে অভ্যন্তরীণ সড়কের অবস্থাও ভালো নয়। রায়েরবাজার বৈশাখী খেলার মাঠের সাদেক খান সড়ক থেকে রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত প্রায় ২৫০ মিটার গলির প্রায় পুরোটাই ভাঙা। বিভিন্ন জায়গায় বড় গর্ত, কোথাও পানি। আরসিসি ঢালাইয়ের এই সড়কের কয়েক জায়গায় লোহার রডও বেরিয়ে এসেছে।
খিলক্ষেতের পোস্ট অফিস সড়ক, নামাপাড়া, বাঁশতলা, ডুমনির তালনি, কুড়িল কাজীবাড়ি মসজিদ রোড ও ভাটারা বারবিঘা সড়কের বিভিন্ন অংশেও গর্ত ও ভাঙন দেখা গেছে।
প্রয়োজনের তুলনায় টাকা কম থাকায় একসঙ্গে সব সড়কে সংস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমিত বরাদ্দ দিয়ে জরুরি ও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ককে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।নূর আজিজুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী, ডিএসসিসি
ভাটারা বারবিঘা সড়কের এক পাশে বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় যানবাহনকে অন্য পাশ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ছোলমাইদ, পশ্চিম নুরেরচালা ও মিরপুরের পল্লবীর কয়েকটি সড়কের একই দশা।
মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ার সি, ডি, ই ও এফ ব্লকের বিভিন্ন সড়কেও পিচ উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে। বি-ব্লকের ২/১৯ নম্বর ভবনের সামনের ভাঙা অংশ স্থানীয় বাসিন্দারা ইট-কংক্রিট দিয়ে ভরাট করেছিলেন। এর পাশেই আবার নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেখানে জমছে নোংরা পানি।
এ-ব্লকের ৮/৮ নম্বর বাড়ির সামনের সড়কেও বড় গর্ত রয়েছে। একই ব্লকের ১ নম্বর সড়কের এক পাশ প্রায় ছয় মাস আগে কাটা হলেও এখনো কার্পেটিং হয়নি।
‘মনে হয় রাস্তায় পাথর আইনা ফালাই রাখসে’
ঢাকা দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায়ও ভাঙাচোরা সড়ক, খানাখন্দ ও গর্তের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও দীর্ঘদিন ধরে কেটে রাখা সড়ক মেরামত হয়নি, কোথাও চলমান সংস্কারকাজের ধীরগতিতে দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ।
ডিএসসিসির ব্যস্ততম সড়কগুলোর একটি অতীশ দীপঙ্কর সড়ক। সড়কটির মুগদা হাসপাতাল অংশ থেকে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম পর্যন্ত সায়েদাবাদের দিকে যাওয়ার অংশটি প্রায় ছয় মাস আগে কাটা হয়েছিল। এরপর আর কার্পেটিং করা হয়নি। কাটা কার্পেটিং এখন বড় বড় পাথরখণ্ডের মতো উঁচু-নিচু হয়ে আছে। ওই অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল কঠিন।
ওই সড়কে চলাচলকারী রাইদা পরিবহনের চালক আলম হোসেন বলেন, ‘মনে হয় রাস্তায় পাথর আইনা ফালাই রাখসে। কোনো কাজই হইলো না। কিন্তু রাস্তা কাইটা রাইখা দিল। সড়কে অলটাইম জ্যাম লাগে, যাত্রীগো কষ্ট হয়।’
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ বলছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কর্তৃপক্ষ অনুমতি না নিয়েই ওই সড়ক কেটেছিল। করপোরেশনের বাধার মুখে প্রায় পাঁচ মাস কাটা অবস্থায় পড়ে ছিল। পরে সমঝোতা চুক্তি হলেও বর্ষার কারণে ট্রাফিক পুলিশ কাজের অনুমতি দিচ্ছে না।
কাজ চলছে, শেষ হচ্ছে না
সবুজবাগের বাসাবো থেকে মাদারটেক ও নন্দীপাড়া পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে। পানিনিষ্কাশনের নালার কাজ শেষ হয়েছে। এখন সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হওয়ার কথা।
১৬ আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক কাজ হয়েছে। ঠিকাদারের ধীরগতিতে ব্যস্ত এই সড়কে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহনচালকেরা। ডিএসসিসির প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ঠিকাদারকে কাজ শেষ করার জন্য আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
সড়কটির শুরুর প্রায় ২৫০ মিটার অংশ ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা। ওই অংশে পানিনিষ্কাশনের নালার কাজ করা হয়নি।
ডিএসসিসির অঞ্চল-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ওই অংশে নালার অবস্থা ভালো আছে। সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হলে ওই অংশও মেরামত করা হবে।
কাছেই বাসাবো বৌদ্ধমন্দির সড়কের বিভিন্ন স্থানেও গর্ত ও ভাঙন রয়েছে। প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কটি সংস্কার প্রয়োজন। তবে বর্তমানে তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। সড়ক সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প অনুমোদন হলে ওই সড়কের কাজ করা হবে।
অঞ্চল-২-এর মালিবাগ মোড় থেকে গ্রিনলাইন কাউন্টারের সামনের সড়ক এবং খিলগাঁও রেলগেট থেকে ভেতরের দিকে যাওয়া সড়কেও বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও খানাখন্দ দেখা গেছে।
চার জায়গায় গভীর গর্ত
গেন্ডারিয়া থেকে জুরাইন রেলগেটের দিকে যাওয়ার গেন্ডারিয়া নতুন সড়কের প্রায় পৌনে দুই কিলোমিটারে অন্তত চার জায়গায় রাস্তা ভেঙে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তের গভীরতা এক থেকে দেড় ফুট। গর্তের গভীরতা বেশি হওয়ায় সড়কের মধ্যে বাঁশের খুঁটি পুঁতে বিপৎসংকেত চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। এসব গর্ত এড়িয়ে চলতে হচ্ছে যানবাহনকে। চারটি বড় গর্ত ছাড়াও ওই সড়কের আরও ১১টি স্থানে রাস্তা ভাঙাচোরা দেখা গেছে।
এর পাশের মীর হাজীরবাগ সড়কটিও ভাঙাচোরা ও এবড়োখেবড়ো। সড়ক দিয়েই নালার নোংরা পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ভাঙা রাস্তার গর্তে জমে আছে কালো দুর্গন্ধযুক্ত পানি।
এ ছাড়া পুরান বকশীবাজারের উর্দু রোড, লালবাগের উমেশ দত্ত রোড, চকবাজারের দ্বীন মোহাম্মদ রোড, চকবাজার থানার সামনের সড়ক, বেগমবাজার রোড, চক সার্কুলার রোড, বংশালের আবুল হাসনাত রোড, স্বামীবাগ লেন, কলতাবাজারের নাসিরউদ্দীন সরদার লেন, আরমেনিয়ান স্ট্রিট, আরমানিটোলার ২ নম্বর এ সি রায় রোড ও শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী রোডের বিভিন্ন অংশেও ভাঙন ও গর্ত দেখা গেছে।
সূত্রাপুরের রূপলাল দাস লেন, পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর ওয়াসা রোড, মাদ্রাসা রোড, নতুন রাস্তা, জুরাইনের হাজী খোরশেদ আলী সরদার সড়ক, কদমতলী, মুরগিটোলা মোড় ও ডিস্টিলারি রোডেরও একই চিত্র।
নীলক্ষেত মোড় থেকে নিউমার্কেটের দিকে যাওয়ার পিলখানা রোডের বিভিন্ন অংশ এবং আগামাসি লেনের অবস্থাও ভালো নয়। সরু আগামাসি লেনের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও ভাঙন রয়েছে। কোথাও কোথাও কাদাপানি জমে থাকায় পথচারীদের চলাচলে কষ্ট হচ্ছে।
হাতিরপুল বাজার থেকে কাঁটাবন সিগন্যালের দিকে যাওয়ার সড়কে আরসিসি ঢালাই করা অংশ ছাড়া অন্য অংশে ভাঙন দেখা গেছে। হাতিরপুল বাজার থেকে পরিবাগ হয়ে সোনারগাঁও রোড, গ্রিন রোড, ধানমন্ডি-১৩ নম্বর সড়ক ও মগবাজারের আউটার সার্কুলার রোডের বিভিন্ন অংশেও একই চিত্র দেখা গেছে।
প্রতিবছর ব্যয়, তবু সংস্কারের প্রয়োজন
দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর সড়ক উন্নয়ন ও সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। তারপরও বর্ষা এলেই প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে গর্ত ও ভাঙন।
ডিএনসিসির সড়কের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার। চলতি অর্থবছরে পুরোনো ৩৬টি ওয়ার্ডে প্রায় ২১০ কিলোমিটার এবং নতুন যুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার বা নির্মাণ প্রয়োজন। অর্থাৎ মোট সড়কের প্রায় ৩০ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে উত্তর সিটিতে ১৩১ দশমিক ৭০ কিলোমিটার সড়ক, ১৩৬ দশমিক ৯ কিলোমিটার নালা ও ৪৮ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়নে প্রায় ৩১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আরও প্রায় ১০২ কিলোমিটার সড়ক ও ৯৬ কিলোমিটার নালার কাজ হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে সড়ক, নালা ও ফুটপাত নির্মাণে প্রায় ৫৬৮ কোটি টাকা এবং বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে ৫৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী-১ খন্দকার মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষায় বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে পটহোল ও ফাটল তৈরি হয়। এগুলো নিয়মিত মেরামত করা হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে প্রতি রাতে প্রায় ৪০ টন অ্যাসফল্ট মিশ্রণ দিয়ে গর্ত ও খানাখন্দ মেরামত করা হচ্ছে।
ডিএসসিসিতেও সংস্কারের প্রয়োজন
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মোট সড়ক প্রায় ১ হাজার ৫৫৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১২০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার বা নির্মাণ প্রয়োজন।
গত অর্থবছরে ৫০ কিলোমিটার সড়ক, ৩৭ কিলোমিটার নালা ও ২ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়ন করা হয়েছে। বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে আরও প্রায় ১৭ কিলোমিটার সড়ক ও ১০ কিলোমিটার নালার কাজ হয়েছে।
এই সিটির জন্য চলতি অর্থবছরে সড়ক, নালা ও ফুটপাত নির্মাণে প্রায় ২৬৬ কোটি টাকা এবং বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে এই প্রকৌশলীর ভাষ্য, প্রয়োজনের তুলনায় টাকা কম থাকায় একসঙ্গে সব সড়কে সংস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমিত বরাদ্দ দিয়ে জরুরি ও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ককে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।