রাতে চলাচলের সময় ২০ মিনিট বাড়ানোর পর মেট্রোরেলে যাত্রীও বেড়েছে। এখন রাতেও দিনের ব্যস্ত সময়ের প্রায় কাছাকাছি ভিড় হচ্ছে মেট্রোরেলে। তাই রাতে মেট্রোরেলের চলাচলের সময় আরও বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
রাজধানীতে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, বাড়তি সময়ে চলাচল শুরুর পর প্রতিদিন গড়ে যাত্রী বেড়েছে সাড়ে আট হাজারের মতো।
রাতের শেষ ট্রেনে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন সাংবাদিক রাজীব আহমেদ। কারওয়ান বাজার থেকে মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় যাতায়াত করেন তিনি। রাজীব আহমেদ জানান, ১৩ জুন সাড়ে ১০টার ট্রেনে তিনি ভিড়ের কারণে উঠতে পারেননি। পরে শেষ ট্রেন ধরেন। সেটি কারওয়ান বাজারে আসে ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে।
রাজীব আহমেদ আরও বলেন, তিনি দুপুর ১২টার দিকে শেওড়াপাড়া থেকে কারওয়ান বাজারে আসেন। সে সময় যেমন ভিড় থাকে, তার কাছাকাছি ভিড় তিনি রাতের শেষ ট্রেনেও দেখেছেন।
৭ জুন থেকে রাতে মেট্রোরেলের চলাচল উভয় দিক থেকে ২০ মিনিট করে বাড়ানো হয়। এর ফলে রাতে মতিঝিল থেকে উত্তরার পথে সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ছে সাড়ে ১০টায়। আর উত্তরা থেকে রাতের সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ছে ৯টা ৫০ মিনিটে। এ সময়ে উত্তরা থেকে একটি এবং মতিঝিল থেকে একটি করে মোট দুটি ট্রেন বাড়তি চলাচল করছে।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, একেকটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন। সেই হিসাবে দুটি বাড়তি ট্রেনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৬০০ যাত্রীর যাতায়াত করা সম্ভব। কিন্তু রাতে সময় বাড়ানোর ফলে সাড়ে ৮ হাজারের মতো যাত্রী কীভাবে বেড়ে গেল?
এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়, সময় বাড়ানোর কারণে শেষ ট্রেনের আগের দুই থেকে তিনটি ট্রেনেও যাত্রী ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এর কারণ, আগে অনেকেই শেষ ট্রেন ধরা সম্ভব হবে না ভেবে বিকল্প যানবাহন বেছে নিতেন। সময় বাড়ানোর ফলে শেষ ট্রেনের যাত্রীর সঙ্গে নতুন যাত্রীও যুক্ত হয়েছেন।
ডিএমটিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, সময় বাড়ানোর আগে কর্মব্যস্ত একেক দিনে চার লাখ বা এর সামান্য কিছু বেশি যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াত করতেন। গত রোববার যাত্রীসংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ২৯ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
মেট্রোতে বিকেল ৫টার পর থেকেই মিরপুর-উত্তরামুখী যাত্রীদের বেশি চাপ দেখা যায় কারওয়ান বাজার স্টেশনে। শুক্র ও শনিবারও এর ব্যতিক্রম নয়। বেসরকারি চাকরিজীবী আবু হুরায়রা জানান, তিনি গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৮টায় কারওয়ান বাজার স্টেশন থেকে মিরপুরের দিকে যাচ্ছিলেন। তখন শত শত মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন। ভিড়ের কারণে প্রথম ট্রেনে উঠতে পারননি তিনি। অনেক কষ্টে দ্বিতীয় ট্রেনে উঠেছেন। কিন্তু সেখানেও এত ভিড় যে পা রাখার জায়গা পাচ্ছিলেন না।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সকালের শুরুর দিকের চেয়ে রাতে মেট্রোরেলে যাত্রী বেশি হচ্ছে। সেটা বিবেচনায় নিয়ে রাতে ট্রেন চলাচলের সময় আরও বাড়ানোর কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে আগামী মাস থেকে তা কার্যকর হতে পারে। এর ফলে দিনের সর্বশেষ ট্রেন মতিঝিল থেকে রাত ১১টায় ছাড়বে। আর উত্তরা থেকে ছাড়বে রাত ১০টা ২০ মিনিটে।
এখন প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টায় উত্তরা থেকে মতিঝিলগামী দিনের প্রথম মেট্রোরেল ছাড়ে। আর মতিঝিল থেকে উত্তরাগামী দিনের প্রথম মেট্রোরেল ছাড়ে সকাল সোয়া ৭টায়। সকালে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ানোর বিষয়ে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানিয়েছে।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতে মেট্রোরেলের চলাচলের সময় আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে গত মে মাসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। লক্ষ্য ছিল রাতে চলাচল ৫০ মিনিট বাড়ানো। কিন্তু যাত্রী পাওয়া যাবে কি না, অনিশ্চয়তায় মেট্রোরেল চলাচলের সময় ২০ মিনিট বাড়ানো হয়। এখন উভয় দিক থেকে দুটি মেট্রোরেল ১০ মিনিট বিরতিতে চলাচল করছে।
ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সর্বশেষ ২০ মিনিট সময় বাড়ানোর পর মেট্রোরেলে যাত্রীর চাপ বেড়েছে। তাই রাতে চলাচলের সময় আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, রাতে মেট্রোরেলের চলাচল বন্ধ এবং সকালে চালুর মাঝের সময়টায় ট্রেন, লাইন ও ওয়ার্কশপে রক্ষণাবেক্ষণের নানান কাজ করতে হয়। তাই বাড়তি সময় মেট্রোরেল চালাতে হলে নানা কারিগরি প্রস্তুতির দরকার রয়েছে। এখন প্রস্তুতিমূলক সেসব কাজ করা হচ্ছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল—এ পথে যাতায়াতের জন্য এখন ২৪ সেট ট্রেন আছে। প্রতি সেটে ৬টি কোচ। বর্তমানে পিক আওয়ারে ১২ সেট ট্রেন সার্বক্ষণিক চলাচল করছে। ডিএমটিসিএলের সূত্র জানায়, বাড়তি সময়ে ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হলে ১৪ সেট ট্রেন সার্বক্ষণিক ব্যবহার করা হবে।
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, সাড়ে তিন মিনিট পরপর একটি করে ট্রেন চালানোর সক্ষমতা আছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মেট্রোরেল চলবে বলেও প্রকল্প নেওয়ার সময় অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু লোকবলের অভাবে তা হয়নি। এখন পর্যায়ক্রমে সময় বাড়ানো হচ্ছে।
অনুমান অনুযায়ী, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিদিন পাঁচ লাখ যাত্রী যাওয়ার কথা। বর্তমানে মেট্রোরেলে দিনে গড়ে সোয়া চার লাখের মতো যাত্রী যাতায়াত করেন। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। বর্ধিত অংশ আগামী বছর চালু হতে পারে। তখন দিনে যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে যাওয়ার কথা।
ঢাকায় ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়। শুরুতে চলাচল করত উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত। পর্যায়ক্রমে স্টেশনের সংখ্যা বাড়ে। মতিঝিল পর্যন্ত সব স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা শুরু হয় ২০২৩ সালের শেষ দিনে।
৮ জুনের কথা। রাতের শেষ ট্রেনে মিরপুরে যাচ্ছিলেন এক নারী। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি। অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কারওয়ান বাজার থেকে তাঁর সঙ্গে ওই দিন ১০ জন যাত্রী নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোচে উঠেছেন। মেট্রোরেল বাড়তি সময় না চললে সবাইকে বাসে বা অন্য কোনো যানবাহনে যেতে হতো।
ওই নারী আরও বলেন, মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ানোটা দারুণ কাজ। তাঁরা এখন রাত ১০টার পরও নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছেন। তাঁর মতে, ঢাকার রাস্তায় রাত ১১টা পর্যন্ত যাত্রীর চাপ থাকে। মেট্রোরেল চলাচলের সময় আরও কিছুটা বাড়াতে পারলে ভালো হয়।