গ্যাসের তীব্র সংকটে রান্নার চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ায় বাড়িওয়ালা ছাদে ভাড়াটেদের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন আলাদা রান্নাঘর। সেখানে মাটির চুলায় কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করছেন তাঁরা। এলএনজি সরবরাহ কমে সারা দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে, এর প্রভাবে গৃহস্থালির রান্নার পাশাপাশি শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। কাঠবাগিচা, গেন্ডারিয়া, পুরান ঢাকা, ২০ আগস্ট
গ্যাসের তীব্র সংকটে রান্নার চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ায় বাড়িওয়ালা ছাদে ভাড়াটেদের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন আলাদা রান্নাঘর। সেখানে মাটির চুলায় কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করছেন তাঁরা। এলএনজি সরবরাহ কমে সারা দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে, এর প্রভাবে গৃহস্থালির রান্নার পাশাপাশি শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। কাঠবাগিচা, গেন্ডারিয়া, পুরান ঢাকা, ২০ আগস্ট

চুলা জ্বলছে নিবু নিবু, গ্যাস না পেয়ে ক্ষুব্ধ গাড়িচালকেরা

মিরপুরের আমতলা এলাকার টিনের ছাউনির একটি ঘরে আটটি কক্ষ। থাকে আটটি পরিবার। আট পরিবারের রান্নার ঘর একটি, সেখানে আছে একটি গ্যাস–সংযোগের দুটি চুলা। সেই চুলায় পালা করে রান্না করেন আট পরিবারের নারীরা। কিন্তু গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে এক পরিবারের রান্না শেষ করতেই লেগে যাচ্ছে কয়েক ঘণ্টা। ফলে চুলার পাশে অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরের পরিবারের সদস্যদের। কেউ কেউ রান্নার সুযোগও পাচ্ছে না।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই রান্নাঘরে বসে রান্না করছিলেন শিরিন বেগম। বেলা ১১টার দিকে রান্না শুরু করেছেন। দেড় ঘণ্টা পরেও শেষ হয়নি একটি পদ। চুলায় এক পাতিলে ছোট মাছের ভুনা, অন্যটিতে পানি গরম করছিলেন তিনি। সেই পানি গরম হলে তাতে চাল দিয়ে ভাত বসাবেন।

শিরিন বলেন, গ্যাসের চাপ এত কম যে চুলায় সরাসরি পানি-চাল দিয়ে ভাত রান্না করা যাচ্ছে না। আগে পানি গরম করে নিতে হয়। এরপর চাল দিয়ে কোনোমতে রান্না করতে হয়। মাছের তরকারি রান্না শেষ হওয়ার পরেও ভাত হতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা লেগে যায়। গ্যাসের সংকটে রান্না নিয়ে বিরক্ত শিরিন বলেন, ‘একবার রানতেই দিন পার।’

শিরিনের আগে একই চুলায় রান্না করেছেন রেশমা বেগম। মাছ ভুনা, কচুমুখি-চিংড়ি ও ভাত রান্নার পাশাপাশি রাতের রান্নাও একসঙ্গে সেরে নিয়েছেন তিনি। সকাল আটটায় রান্না শুরু করে শেষ করেছেন বেলা ১১টার দিকে।

‘আমরা তো ঘরে থাকি, আস্তেধীরে রানদি। কামে যাওয়া মাইয়াগো কষ্ট বেশি। ভোর চাইরটা থেকে উইঠা রানদা লাগে। অনেক সময় চুলাই জ্বলে না, গ্যাস কম থাহে, ভাত-তরকারি পাকে না।’
শিরিন বেগম, গৃহিণি, মিরপুর, ঢাকা

রেশমা জানান, তিনি ও শিরিন গৃহিণী। বাকিদের মধ্যে তিনটি পরিবারের নারীরা তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। আর একজন করেন বাসাবাড়ির কাজ, একজন স্বামীর সঙ্গে দোকানে কাজ করেন। গ্যাসের সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বাইরে কাজে যাওয়া নারীরা।

রেশমা বলেন, ‘আমরা তো ঘরে থাকি, আস্তেধীরে রানদি। কামে যাওয়া মাইয়াগো কষ্ট বেশি। ভোর চাইরটা থেকে উইঠা রানদা লাগে। অনেক সময় চুলাই জ্বলে না, গ্যাস কম থাহে, ভাত-তরকারি পাকে না।’

গ্যাস সংকটে চুলা না জ্বলায় মাটির চুলায় চলছে রান্না। আজ বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায়

শুধু আমতলা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকটে রান্নায় সমস্যা হচ্ছে। কোথাও চুলায় গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্না করতে স্বাভাবিক সময়ের কয়েক গুণ বেশি লাগছে। কোথাও আবার দিনের বড় একটা সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন গাড়িচালকেরা। গ্যাস না থাকায় কোনো কোনো স্টেশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর সঙ্গে দিনের বিভিন্ন সময় ও রাতের লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।

‘সরকার গ্যাস বন্ধ করলে একেবারে বন্ধ করে দিক। এই যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। অল্প অল্প গ্যাস নিয়া কিছুই হয় না। না চালানো যায় গাড়ি, না হয় রোজগার, না থাকে মালিকের পয়সা।’
মামুন মিয়া, বাসচালক, ঢাকা

মিরপুরের সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফাহিমা আক্তারের ঘরেও বদলে গেছে রান্নার সময়। তিনি বলেন, আগে দুপুর ১২টার দিকে রান্না বসালে বেলা একটা থেকে দেড়টার মধ্যে রান্না শেষ হয়ে যেত। এখন আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ গ্যাসও পাওয়া যায় না। দুই চুলা একসঙ্গে জ্বালানো যায় না। একটি চুলা বন্ধ রাখলে অন্যটিতে কিছুটা গ্যাস আসে। এ কারণে সকালের নাশতা শেষ করেই সকাল ১০টার দিকে দুপুর ও রাতের রান্না শুরু করতে হয় বলে জানান ফাহিমা।

গ্যাসের সংকট তাঁর পরিবারের সকালের খাবারের অভ্যাসও বদলে দিয়েছে। ফাহিমা বলেন, ‘সকালে ছেলের বাবা পান্তা খায়। তাই অফিসে যাওয়ার আগে স্বামীর নাশতা নিয়ে ঝামেলা হয় না। গ্যাসের সমস্যা হওয়ার পর থেকে ছেলেও এখন বাবার সঙ্গে পান্তা খাওয়া শুরু করছে।’

সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার অপেক্ষা

রান্নাঘরের মতোই গ্যাসের সংকটের চিত্র দেখা গেছে মিরপুরের সিএনজি স্টেশনগুলোতে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে কয়েক মিনিট সময় লাগছে। ফলে স্টেশনের ভেতর ও বাইরে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ সারি।

মিরপুর সিরামিকস রিফুয়েলিং অ্যান্ড কনভারশন সেন্টারের ডিসপেনসার অপারেটর মোহাম্মদ আকাশ বলেন, আজ গ্যাসের চাপ গত কয়েক দিনের তুলনায় আরও কম। গত কয়েক দিন চাপ ছিল ৮০ থেকে ৯০। আজ সর্বোচ্চ পাওয়া যাচ্ছে ৭০।

এই চাপে ৬০ কেজির একটি সিলিন্ডারে ১৮০ থেকে ২০০ টাকার গ্যাস ভরতে তিন থেকে চার মিনিট সময় লাগে বলে জানান তিনি। প্রতিটি ডিসপেনসারিতে দুটি সংযোগ থাকলেও একসঙ্গে দুটি গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে না। কারণ, দুটি গাড়িতে একসঙ্গে গ্যাস দিলে চাপ আরও কমে যায়। তখন একটি গাড়িতে ৮০ থেকে ১০০ টাকার বেশি গ্যাস ঢোকে না।

গ্যাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও সামান্য গ্যাস নিয়ে ফিরতে হচ্ছে চালকদের। ওই স্টেশনে সকাল ৮টা ২০ মিনিটে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ব্যক্তিগত গাড়ির চালক খোরশেদ আলম। বেলা ১১টার কয়েক মিনিট পর তিনি গ্যাস নেওয়ার সুযোগ পান। অর্থাৎ প্রায় দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিট অপেক্ষা করেছেন। এতক্ষণ অপেক্ষার পর তাঁর গাড়িতে গ্যাস ঢুকেছে ১৭৮ টাকার।

খোরশেদ বলেন, ‘প্রেশার (গ্যাসের চাপ) বেশি থাকলে এই টাকার গ্যাস দিয়ে এসি চালিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার গাড়ি চলত। এসি বন্ধ রাখলে ৩৮-৪০ কিলোমিটারও চলত। কিন্তু প্রেশার কম থাকলে গ্যাসের সঙ্গে হাওয়া ঢুকে যায়। তখন ৩০ কিলোমিটারও হয়তো চলবে না।’

যাত্রীবাহী বাসের চালক মামুন মিয়ার ভোগান্তিও কম নয়। মিরপুর সুপার লিংকের এই চালক বলেন, সাধারণত তাঁর বাসে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকার গ্যাস ঢোকে। কয়েক দিন আগেও ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার গ্যাস ঢুকত। অথচ আজ গ্যাস ঢুকেছে মাত্র ২৬০ টাকার।

গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো গাড়িতে গ্যাস দিতে পারছে না ফিলিং স্টেশনগুলো। এতে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে মিরপুর–১২ নম্বরে সিরামিক রোডের ফিলিং স্টেশনের চিত্র  

মামুন বলেন, ‘এই গ্যাস দিয়ে কোনোমতে একবার মিরপুর থেকে আজিমপুর যাওয়া-আসা করা যাবে, তা–ও রাস্তায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার রিস্ক (ঝুঁকি) আছে। এখন এই গ্যাস নিয়া কী করুম!’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকার গ্যাস বন্ধ করলে একেবারে বন্ধ করে দিক। এই যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। অল্প অল্প গ্যাস নিয়া কিছুই হয় না। না চালানো যায় গাড়ি, না হয় রোজগার, না থাকে মালিকের পয়সা।’

আজ সকাল ছয়টা থেকে ট্রিপ শুরু করে একবার মিরপুর থেকে আজিমপুর এবং আবার আজিমপুর থেকে মিরপুর এসেছেন বলে জানান মামুন।

কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও দীর্ঘ সারি

গ্যাসের চাপ না থাকায় মিরপুরের মিনারভা সিএনজি স্টেশন ও শাহজালাল সিএনজি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। শাহজালাল সিএনজি স্টেশনের কর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, রাত একটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত গ্যাস ছিল। ওই সময় গাড়িতে গ্যাস দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে লাইনে গ্যাস নেই।

আর আরিয়া সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সেখানে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছিল ৩৯টি প্রাইভেট কার ও ৪৩টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অটোরিকশার সারি সড়কের উল্টো দিকেও ছড়িয়ে পড়েছিল।